আবু সাঈদ খান : আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া আওয়ামী লীগের ১১ দফা ও বিএনপির ২০ দফা। তবে তা ছাপিয়ে উঠেছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া সম্পর্কে সিইসির প্রশংসা-সূচক বক্তব্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে. এম. নুরুল হুদা প্রারম্ভিক বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি খালেদা জিয়ার সরকারকে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সেই সঙ্গে ছিল বিএনপির শাসনামলের সাফল্যের ফিরিস্তি। ইতিপূর্বে কোনো সিইসির মুখ থেকে রাজনৈতিক নেতা বা দল সম্পর্কে এমন প্রশংসামূলক বক্তব্য শোনা যায়নি; যা বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিএনপি নেতাদের বিস্ট্মিত করেছিল। সিইসির বক্তব্য দেওয়ার সময় একে অন্যের দিকে বিস্ট্ময়ভরে তাকাচ্ছিলেন। তবে বিষয়টিকে তারা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেন এবং সিইসি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেছেন বলে মন্তব্য করেন। ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ওইদিনই এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে সান্ত্বনার সুরে বলেন, এটি বিএনপিকে নির্বাচনে আনার কৌশল হতে পারে। সে যাই হোক, গত ১৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দলটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির পিতা আখ্যায়িত করে তার রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনার সব ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সব সফল অর্জন আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত ধরে এসেছে। নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক স্বাধীনতা পেয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন পৃথিবীর অনেক দেশের কমিশনের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। আমারও মনে হয়, এসব প্রশংসা দল দুটিকে তুষ্ট করার কৌশল। এতে আপত্তির কিছু নেই। যে দেবতা যে ভোগ চায়, তাকে সেই ভোগই দিতে হয়।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রস্তাবনামায় নির্বাচন কমিশন গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে বিসাদৃশ্য তেমন কিছু বলা হয়নি। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রস্তাবনায় নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের ভেতরের ও বাইরের বেশ কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রস্তাবনামায় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোনো কথা নেই। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার-বহির্ভূত বিবেচনায় থাকারও কথা নয়। অথচ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়েই মূল বিতর্ক। নির্বাচন সম্পর্কিত বলে বিতর্কটি নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে গড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের বক্তব্য হচ্ছে- বর্তমান সরকারই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবে। বিএনপির দাবি- সহায়ক সরকার; যা নির্বাচনী প্রস্তাবনামায় সর্বাগ্রে স্থান পেয়েছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এখনও এর রূপরেখা দেওয়া হয়নি। তবে আজকের বাস্তবতায় দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নেই। তাই যে প্রস্তাবই দেওয়া হোক না কেন; তাদের লক্ষ্য হতে পারে- বিরোধী দল বা নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিপরিষদের পুনর্গঠন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে মন্ত্রিপরিষদে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি তখন সাড়া দেয়নি। এবার ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হবে কি-না জানি না। তবে ১৪ অক্টোবর এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয়, আলোচনা করে তার একটা পথ বের করব। আমরা চাই, মানুষ মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করবে। যার যার প্রতিনিধি সে সে বেছে নেবে।’ ( সমকাল, ১৫ অক্টোবর ২০১৭)। তাই সংবিধানের আলোকেই বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার পুনর্গঠিত হতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে- বিএনপি সংসদে নেই; কী করে তাদের মন্ত্রিপরিষদে নেওয়া হবে? সে ক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বা মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্টদের সদিচ্ছাই বড় কথা। বিএনপি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এটি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের রেওয়াজ। আর বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দিয়েও নির্বাচন করার সুযোগ আছে। আর সেটি জরুরি এই কারণে যে, যখন একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তখন অপর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সুযোগের সমতা রক্ষা করা যাবে না। এ বিবেচনায় নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়াই যৌক্তিক বলে মনে করি।
আমাদের মনে রাখা দরকার, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন সময়ের দাবি। আর সে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দূরত্ব। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা। আর সেটি প্রতিষ্ঠিত হলে সংবিধান কোনো বাধা নয়। এ উদাহরণের জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, তা সংবিধান নির্দেশিত পথে নয়, রাজনৈতিক মতৈক্যের ভিত্তিতেই হয়েছিল। এখনও রাজনৈতিক অঙ্গনের মতৈক্য অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার দায় রাজনীতিকদের। এটি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। কথাটি সংবিধানসম্মত। তবে প্রয়োজনে ইসি দূতিয়ালি বা মধ্যস্থতাও করতে পারে। আইন এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। অর্থবহ নির্বাচনের যা যা করার দরকার, ইসি তা তা করবে- সেটিই প্রত্যাশিত।
বিএনপির ২০ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নির্বাচনকালে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, ১৯১৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯-৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ অনুযায়ী সেনা মোতায়েন করা যাবে। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। আমার মনে হয়, আজকের বাস্তবতায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সেনা মোতায়েনও আবশ্যক; তবে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। যেভাবে পুলিশর্-যাবের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন, সেভাবেই সেনাসদস্যদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট থাকতে পারেন।
আওয়ামী লীগ বর্তমান নির্বাচনী এলাকা বহাল রাখার পক্ষপাতী। বিএনপি নির্বাচনী এলাকা ২০০৮ সালের আগের অবস্থায় পুনর্বহালের প্রস্তাব করেছে। যেখানে আদমশুমারি অনুযায়ী যে পরিবর্তন হয়েছে, তা বাতিল করা হবে খারাপ উদাহরণ। সে ক্ষেত্রে নতুন করে সীমানা নির্ধারণ বা বর্তমান সীমানা বহাল রাখাই যুক্তিযুক্ত। ইভিএম পদ্ধতি চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি বিরোধী। তবে এটির জন্য যে প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা নির্বাচন কমিশনের নেই।
ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপির মধ্যে একটা কিছু মিল রয়েছে। উভয় দলই ‘না ভোট’ চায় না। তারা জানতে দিতে চায় না যে, তাদের পছন্দ করে না এমন ভোটারের সংখ্যা কত। ‘না ভোট’ দেওয়া যে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, তা উপেক্ষার সুযোগ নেই। এই দুই বড় দলের আরও একটি মিলের জায়গা হচ্ছে, কেউ বর্তমান ভোট পদ্ধতির কোনো মৌলিক সংস্কার চায় না। এই দুই দল ছাড়া সবাই সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি বা মিশ্র পদ্ধতির (অর্ধেক এলাকাভিত্তিক এবং অর্ধেক সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি) কথা বলছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বর্তমান পদ্ধতিই আঁকড়ে ধরতে চাইছে।
দুই বড় দলের প্রস্তাবে কালো টাকা ও পেশিশক্তিমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নেই। দল দুটির প্রস্তাবে সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধের বিষয়গুলো নিয়ে মতামত দেওয়া হয়নি। রাজনীতিতে এসব কিছু যে সমস্যা তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। নির্বাচনী ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। নির্বাচন এখন বিনিয়োগ। কোনো সৎ ও ত্যাগী মানুষ নির্বাচনের কথা ভাবতে পারেন না। সে বিবেচনায় সৎ ও যোগ্যদের নির্বাচন ও রাজনীতিতে স্থান করে দিতে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পোস্টার (একই পোস্টারে থাকতে পারে সব প্রার্থীর নাম, ছবি, প্রতীক ইত্যাদি) সরবরাহ করতে পারে। প্রার্থীদের নিয়ে একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচার ও যৌথ সভার ব্যবস্থা করতে পারে। সেই সঙ্গে আইন ও বিধির পরিবর্তন ও কঠোর অনুসরণ-যাতে কোনো ঋণখেলাপি, টাকা পাচারকারী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মের ব্যবহার রোধে বিধি আছে, তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে, যে কোনো ধর্ম বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যাতে রাজনীতিতে ব্যবহূত না হয়।
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে সমঝোতায় আসতে হবে। কালো টাকা-পেশিশক্তি-সাম্প্রদায়িকতামুক্ত পরিবেশের কথাও ভাবতে হবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে এসব কিছু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক

আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক
ask_bangla1971@yahoo.com