আবু সাঈদ খান : মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি মুখ খুলেছেন। ২৫ আগস্ট সেনা অভিযানের পর বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাকে মানবতার পক্ষে অবস্থান নিতে বলছিলেন। তিনি নীরব ছিলেন, প্রকাশ্যে কিছুই বলছিলেন না। এই প্রথম নীরবতা ভাঙলেন। গত ১৯ সেপ্টেম্বর টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি রাখাইন থেকে মুসলিমদের পালিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, পালিয়ে যাওয়ার কারণও খতিয়ে দেখবেন। এবং যাচাই-বাছাই করে তাদের ফেরত নেবেন। সমগ্র বিশ্ব জানে কেন রোহিঙ্গারা পালিয়ে গেলেন, তিনি জানেন না। এও কি বিশ্বাসযোগ্য? তবে কি না জানার ভান করে সত্যকে আড়াল করতে চাইছেন?
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বর্বরতায় বিশ্ববাসী আজ স্তম্ভিত। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারাবিশ্ব এ নৃশংসতা দেখেছে। জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায় নিন্দা জানাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এই বর্বরতাকে ‘টেক্সট বুক কেস অব এথেনিং ক্লিনজিং’ বলেছেন। কিন্তু মিয়ানমারে বসে সু চি নিশ্চিত হতে পারেননি- সেখানে কী ঘটেছে? তার কাছ থেকে ঘটনার হোতাদের জন্য নিন্দা জানানো সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশিত ছিল- তা জানালেন না। জানি না তিনি কি জান্তার ভয়ে ভীত, না এখনও শির উম্নত? যদি জান্তার ভয়ে ভীত হন, তবে বুঝতে হবে- তার কিছু করার নেই। জান্তা যা বলছে- তিনি তাই করবেন। হয়তো জান্তার লিখে দেওয়া ভাষণ পাঠ করেছেন। আর যদি উম্নত শিরের অধিকারী হন, তবে তার কাছ থেকে এমন ভাষণ ছিল অপ্রত্যাশিত।
সু চির ভুলে যাওয়ার কথা নয়- তিনি ও রোহিঙ্গারা একই দুঃসময়ের সহযাত্রী। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর খÿ নেমে আসে। রোহিঙ্গা নিধন নীতি গ্রহণ করা হয়। তখন থেকে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এই জান্তার আমলেই নির্যাতন চলছিল সু চির ওপরও। তাকেও গৃহবন্দি হতে হয়। সু চির দুঃসময় দৃশ্যত কেটেছে। সু চি এখন ডি ফ্যাক্টো সরকারপ্রধান, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে জান্তার খÿ থামেনি। বরং আজ খÿের আঘাতে রোহিঙ্গারা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। এই খÿ যে কত নিষ্ঠুর তা সু চির চেয়ে কে বেশি ভালো জানেন? তিনি এখন জেনেও যদি না জানার ভান করেন; তবে বুঝতে হবে, ক্ষমতার পায়ের নিচে মানবতা পিষ্ট।
কেউ বলতে পারেন যে, তিনি জান্তার সঙ্গে সুর মেলাননি, রোহিঙ্গাদের বাঙালি অনুপ্রবেশকারী বলেননি। তাদের মুসলমান বলেছেন। ধর্মীয়ভাবে তারা মুসলমান, কিন্তু জাতিগত পরিচয় যে রোহিঙ্গা সেটি সু চির অজানা নয়।
রোহিঙ্গাদের আছে হাজার বছরের ইতিহাস। পৃথিবীর ক’টি জাতির তা আছে? অষ্টম শতাব্দীতেই আরব বণিকরা এখানে এসেছিল। এসেছিল পারসি, ইয়েমেনিসহ নানা দেশের বণিকরা। নানা জাতি ও সংস্কৃতির ধারক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। গবেষকরা বলছেন, আরবি শব্দ রহম থেকে রোহাং, রোসাং- এভাবেই রাজ্যের ‘রোসাঙ্গ’ নামকরণ হয়। আর সেই রোসাঙ্গের অধিবাসীরা রোহিঙ্গা। আমরা আরাকান রাজদরবারের বাঙালি কবি আলাওলের লেখায় রোসাঙ্গের কথা জানতে পাই।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বর্মি দখলের আগে সেখানে আরাকান রাজ্য ছিল। পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ‘আরকান’ রাজ্যের উল্লেখ করেছেন। আকবরনামায় আছে ‘আরকাং’। যেটি আরবি শব্দ আল রুকন থেকে এসেছে। আরবিতে আল রুকন মানে শান্তির দেশ। একদা সেখানে ছিল বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মিলিত শাসন। ১৪৩০ সালে নরমেখলা মোগল আনুগত্য স্বীকার করে ‘সুলায়মান শাহ’ নাম ধারণ করে দেশ শাসন করেন। রাজকীয় ভাষা ছিল ফারসি। রাখাইনের বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা ছিল ভাই ভাই। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা ভুঁইফোড় নয়। তখন বঙ্গের সঙ্গে রোসাঙ্গের নানামাত্রিক যোগাযোগ ছিল। গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিল। বরং সে সময়ের বার্মাই ছিল দূরের দেশ।
১৯৪৭ সালে এফ এ গাফফার ও সুলতান মাহমুদ পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন। সুলতান মাহমুদ সংখ্যালঘুবিষয়ক পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ছিলেন। পরবর্তী সময়েও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিরা মিয়ানমার পার্লামেন্টে ছিলেন। ১৯৫৬ সালে জোরা বেগম পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। যিনি মিয়ানমারের প্রথম নির্বাচিত নারী সদস্যদের অন্যতম।
এসব সত্য বিস্ট্মৃত হওয়ার পরও বলব, সু চির বক্তব্য ক্ষীণ আশা জাগিয়েছে। তিনি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নে কাজ করার কথা বলেছেন এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে তাকে এ আন্তরিকতা প্রমাণ করতে হবে। তারা যাতে নিরাপদে স্বভূমে বাস করতে পারে; সেই গ্যারান্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি ১৯ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে মানতে হবে যে, এই মানুষগুলো তার দেশের এবং মিয়ানমার তাদের দেশ। তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।’
সে জন্য প্রয়োজন পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা এবং সেইসঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য নিরাপত্তাবলয় তৈরির কথা ভাবতে হবে, তারাই তাদের এলাকার আইন-শৃগ্ধখলা রক্ষা করবে এবং কোনো প্রকার সেনা হস্তক্ষেপ চলবে না। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ১৯৭৮ সালেও মিয়ানমার সে সময়ে আসা আড়াই লাখ শরণার্থীকে ফেরত নিয়েছিল। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। তাদের মধ্যে অনেকে ফিরে এসেছিল কিংবা এবারও তাদের অনেকে এসেছে।
বাংলাদেশ বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে- সে দেশে কোনো শরণার্থী ঢুকতে দেবে না। ইউরোপের দেশগুলো শরণার্থী নীতি কঠোর করেছে। ভারতের মতো বিশাল দেশ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত পাঠাতে উঠেপড়ে লেগেছে। তখন বাংলাদেশ চার লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। আর বহু দিন ধরে আরও চার লাখ শরণার্থী এখানে অবস্থান করছে। সব মিলে আট লাখ। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ এক কঠিন ব্যাপার। তারপরও বাংলাদেশ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। রয়টার্সের কাছে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যদি আমরা ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারি, তাহলে আরও ৫-৭ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারব।’ এর মানে বাংলাদেশ শরণার্থী ভরণ-পোষণের জন্য সাহায্য চায় না। চায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন, যাতে মিয়ানমারকে তাদের লোক নিয়ে যেতে বাধ্য করা যায়। সেটি করার জন্য জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। এর আগেও চীন ও রাশিয়া ভেটো দিয়েছিল। এবার নিরাপত্তা পরিষদে নিন্দা প্রস্তাবকালে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ভারতের অবস্থানের খানিকটা পরিবর্তন ঘটেছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এগিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট উদ্যোগী। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফল কূটনীতিই পারে সু চি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে; প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের মাধ্যমে যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে তা আরও এগিয়ে নিতে হবে।
এই প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। সরকার ও বিরোধী দলগুলো অভিম্ন মত পোষণ করছে। সব ধর্মের, সব মতের মানুষ সহমত পোষণ করছে। বাংলাদেশের হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতারাও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বৌদ্ধ সম্প্রদায় শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ ও রক্তদান করেছে। এবার প্রবারণা পূর্ণিমায় তারা ফানুস ওড়াবে না। ওই অর্থ শরণার্থীদের সাহায্য করা হবে। বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেছেন, মিয়ানমারে যে বর্বরতা চলছে, তা বুদ্ধের নীতিবিরোধী। তারা একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে মিয়ানমার যাবেন।
মানুষের মধ্যকার এই সম্প্রীতিই আমাদের শক্তি। বায়তুল মোকারম মসজিদে জুমার নামাজে এই সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মোনাজাত করা হয়েছে। দুর্যোগে, দুঃসময়ে বাংলাদেশের মানুষ একাট্টা হয়েছে। জাতির এই ঐক্যবদ্ধ রূপ আমরা দেখেছি বায়াম্নে, উনসত্তরে, একাত্তরে ও নব্বইয়ে। এর প্রকাশ ঘটেছে সিডরে, আইলায় ও বন্যায়। রোহিঙ্গা ইস্যুও আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ ব্যাপারে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।
লেখক
আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক
ask_bangla71@yahoo.com