আবু সাঈদ খান : নাফ নদী দিয়ে বয়ে আসা জনস্রোত থামছে না। রোহিঙ্গা শিশু, নারী, পুরুষ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের কক্সবাজার, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও নানা স্থানে। এখন পর্যন্ত আসা শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখের ওপরে। নানা সময়ে আসা চার থেকে পাঁচ লাখ লোক এখানে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ লাখ। ধনী দেশ নয়, পর্যাপ্ত সম্পদের মালিক নয়_ তা সত্ত্বেও মানবিক তাড়নায় তাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা_ সাধ্যমতো সবকিছু করছে। শরণার্থীদের সেবায় এগিয়ে এসেছে জাতিসংঘসহ আরও কিছু সংস্থা।
আজ যারা এখানে এসেছে তারা সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষ। তবে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে তাদের বসতবাটি ছিল। তা পুড়ে যাওয়া, বুলেটের আঘাতে সন্তান, পিতা বা স্বজনের ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া দেহ, ধর্ষিত মা-বোন-কন্যার আত্মচিৎকার তাদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। উপগ্রহের মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম জানল_ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সে খবর প্রচারিত হওয়ার পর মিয়ানমার সরকার বলল, ওরা দেশত্যাগের আগে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে গেছে। কারও না বোঝার নয় যে, কখনও স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে আগুন দেয় না এবং কেউ দেশত্যাগী হয় না। সরকার আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রকাশিত রাখাইনের বর্বরতার খবর মিথ্যা প্রমাণের জন্য সেনা প্রহরায় একদল সাংবাদিককে রাখাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের একজন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জন থনহেড। তিনি জানতেন, এ ধরনের সরকারি সফরে সরকার যা দেখাতে চায়, তা-ই দেখতে হয়। তবে কখনও কখনও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বোঝা যায় অনেক কিছু। তারা অনেক কিছু আন্দাজ করেছেন। এমনকি একটি গ্রামে তরুণ রাখাইন যুবকদের তলোয়ার উঁচিয়ে পাহারা দিতে দেখেছেন। কোনো সাজানো সাক্ষীর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে আসল সত্য। সাংবাদিকরা তা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা ঘটছে তা গণহত্যা বা জাতিগত নিধন তা নিয়ে আর দ্বিমতের সুযোগ নেই।
এটিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস থেকে শুরু করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি বলে মন্তব্য করেছে। নিন্দা জানিয়েছেন তিব্বতের নোবেল ভূষিত প্রবীণ ধর্মীয় নেতা দালাই লামা থেকে কনিষ্ঠতম নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফ জাই। অং সান সু চির নীরবতার নিন্দা করেছেন আরেক নোবেল ভূষিত আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু। ডেসমন্ড টুটু এক খোলা চিঠিতে বলেন, ‘আমি এখন বৃদ্ধ। আনুষ্ঠানিকভাবে সবকিছু থেকে বিদায় নিয়েছি। নীরবে থাকতে চেয়েছিলাম; কিন্তু তোমার দেশের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলিমদের দুর্দশা দেখে গভীর দুঃখের সঙ্গে সেই নীরবতা ভাঙছি।’ এই প্রবীণ আর্চ বিশপ সু চিকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করতেন। তিনি বলেন, ‘তুমি আমার কাছে প্রিয় ছোট বোন। কয়েক বছর ধরে তোমার একটি ফটোগ্রাফ আমার ডেস্কে রয়েছে। এই ছবি আমাকে ন্যায়বিচার এবং মিয়ানমারের মানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতি ও ভালোবাসার জন্য তোমার নিজেকে উৎসর্গ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তুমি নিজেকে ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছ। ২০১০ সালে তোমার গৃহবন্দি অবস্থা থেকে তোমার মুক্তির আনন্দ উদযাপন করেছিলাম। ২০১২ সালে আমরা তোমার বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচনও উদযাপন করেছিলাম।’ তিনি এটিকে গণহত্যা ও জাতিগত নিধন উল্লেখ করে বলেন, মিয়ানমারের ক্ষমতার শিখরে পেঁৗছানোই যদি তোমার নীরবতার কারণ হয়, তবে নিশ্চিতভাবে সেটি চড়া দাম।’ তিনি তাকে মানবতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে মুখ খুলতে আহ্বান জানিয়েছেন। সু চি এখন আর নীরব নেই। তিনি মুখ খুলেছেন। তবে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পক্ষে নয়, মানবতার পক্ষে নয়; সামরিক জান্তার পক্ষেই মুখ খুলেছেন। তিনি সেখানে মানবতা লঙ্ঘনের মতো কিছু দেখছেন না। তিনি জান্তার সুরেই কথা বলছেন।
সু চির মুখ এখন জান্তার মুখোশে পরিণত হয়েছে। যে কথা মিয়ানমারের সামরিক সরকার বলত, তা আজ নোবেল ভূষিত সু চি বলছেন। তিনি কি জানেন না যে, রাখাইন রাজ্যে হাজার বছর ধরে রোহিঙ্গারা বাস করে আসছে। তারা ১৯৮২ সালের আগেও মিয়ানমারের নাগরিক ছিল। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে গেছেন। মন্ত্রীও হয়েছেন। নে উইন সরকার কলমের খোঁচায় তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিল। আর তা সত্যে পরিণত হলো! আর এটি কেড়ে নেওয়ার পেছনে রয়েছে চরম ধর্মীয় ও বর্ণবাদী মানসিকতা। জনবিচ্ছিন্ন সামরিক শক্তি ক্ষমতা ধরে রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক সরকারগুলোর ধর্মের ব্যবহার দেখেছি, যা জনগণকে বিভক্ত করে। পাকিস্তানের কথা বলা যায়_ সেখানকার সরকার হিন্দুদের তাড়িয়েছে। এখন খ্রিস্টান-শিয়া-কাদিয়ানিদের তাড়া করছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারও হয়তো একই পথে চলবে। আজ রোহিঙ্গারা এর শিকার। তালিকায় অন্যরা আছে। তাদের লক্ষ্য, বর্মি বৌদ্ধদের আধিপত্য। রাখাইনের বৌদ্ধরা হাতিয়ার। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বিতাড়িত হলে রাখাইন বৌদ্ধদের ওপর খড়্গ উঠবে না, তার গ্যারান্টি কী! তাই আমাদের মনে হয়, এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সব জাতিগোষ্ঠীর সতর্ক হওয়া দরকার।
কেউ কেউ বলছেন, সু চি কীবা করবেন? পার্লামেন্টে, মন্ত্রী পরিষদে সামরিক জান্তার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাদের বাইরে তার করার কিছু নেই। তাকে সেনাবাহিনীর মন জুগিয়ে চলতে হয়। জানি না, তিনি ডি ফ্যাক্টো সরকারপ্রধান, না জান্তা পরিচালিত সরকারের শিখণ্ডী। যদি শিখণ্ডী হয়ে থাকেন, তবে তা জান্তার কাছে ‘বিশ্বনন্দিত’ নেত্রীর আত্মসমর্পণতুল্য। আর যদি ডি ফ্যাক্টো সরকারপ্রধান হয়ে একটি জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণে সম্মতি দেন, তবে তা মানবতার প্রতি নির্মম পরিহাস। সে বিবেচনায় তার আর শান্তিতে নোবেল ভূষিত থাকার অধিকার নেই। সারা পৃথিবী থেকে তার কাছ থেকে নোবেল প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটে তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের জন্য চার লাখ লোক দাবি তুলেছে। নোবেল পুরস্কার কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। তবে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের হৃদয় থেকে তার নাম মুছে গেছে। আজ টুটু, দালাই লামাই নয়, সারা দুনিয়ার মানবতাবাদীরা তার সমালোচনায় মুখর। একদা তাকে মহাত্মা গান্ধীর মতো মানবতাবাদী ও মাদার তেরেসার মতো মমতাময়ী বলে আখ্যায়িত করা হতো। এখন তাকে মার্গারেট থেচারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। থেচার ব্রিটেনবাসীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত করে সমালোচিত হয়েছিলেন। তবে থেচারের চেয়ে সু চির ভূমিকা আরও ভয়ঙ্কর।
আমরা ভয়ঙ্কর সু চিকে চাই না, মানবতাবাদী সু চির প্রত্যাবর্তন চাই। আমরা চাই সেই সু চি_যিনি জান্তার নন, মানবতার।
লেখক
আবু সাঈদ খান
ask_bangla71@yahoo.com
সাংবাদিক