আবু সাঈদ খান : আমরা ১৫ আগস্টে শোক ও শ্রদ্ধায় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেছি। দিনটির আরেকটি তাৎপর্য আছে- এটি ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এর একদিন আগের দিন ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্টে উপমহাদেশ থেকে দুইশ’ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসান হয়েছিল। ধর্মভিত্তিক বিভাজনে পূর্ব বাংলা হয়েছিল পাকিস্তানের অংশ। সুদীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ শাসনের যবনিকাপাতে ভারত-পাকিস্তানের জনগণ উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। এ আনন্দ মিছিলে যোগ দিয়েছিল পূর্ব বাংলার জনগণও। তবে বিজয়োল্লাসের মাঝেও বেদনার সুর বেজেছিল। বাংলা, বিহার ও পাঞ্জাবের হিন্দু-মুসলমানের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বিবেকবান মানুষকে ভাবিয়েছিল।

ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও ভারত বিভাজনে মুষড়ে পড়েছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। যখন দিলি্লর লালকেল্লা বিজয় উৎসবে মাতোয়া, তখন তিনি কলকাতার বেলেঘাটায় পরিত্যক্ত হায়দারি মঞ্জিলে সম্প্রীতির আরাধনা করছিলেন। ১৩ আগস্ট গান্ধী যখন সেখানে হাজির হলেন, তখন ক্ষুব্ধ হিন্দুরা বললেন, আপনি এখানে কেন, নোয়াখালী যান। গান্ধী বললেন, নোয়াখালীর দাঙ্গা ঠেকাতে এখানে এসেছি। পাশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দেখিয়ে বললেন, ওর কাছ থেকে পূর্ববঙ্গে দাঙ্গা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছি। সে যাই হোক, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতিই তখন তার এজেন্ডা। আর সে কারণে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিহত হলেন।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু হিন্দু মহাসভা-আরএসএস প্রভৃতি দলের হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের মুখে দৃঢ়তার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির পক্ষেই অঙ্গীকার করেছিলেন। আশার বাণী শুনিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতা আছে মসজিদে বা মন্দিরে যাওয়ার। আপনি যে কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন; তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এমন দিন আসবে, যেদিন হিন্দু হিন্দু থাকবে না, মুসলমান মুসলমান থাকবে না: তা হবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে।’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় জিন্নাহর মৃত্যু হয়। তিনি বেঁচে থাকলে কী হতো জানি না। সবারই জানা, পাকিস্তান জিন্নাহর ঘোষিত নীতির পক্ষে থাকেনি। পাকিস্তানি শাসকরা স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে ধর্মকেই বর্মে পরিণত করেছিল। বলা বাহুল্য, একাত্তরেও ধর্মের দোহাই পেড়ে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
ভারত বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে অটুট ছিল। পূর্বেকার কোনো শাসক ধর্মকে রাজনীতিতে টানেনি। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আর যে সমালোচনাই থাক, ধর্মনিরপেক্ষতার ঝাণ্ডা উঁচিয়ে রেখেছে দলটি। হয়তো মৌলবাদী উত্থান আঁচ করতে পেরে ইন্দিরা সরকার ১৯৭৬ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে সনি্নবেশিত করে। দিলি্লতে অকংগ্রেসীয় সরকারও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করেছে। এমনকি অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকারও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিহার করেনি। আজও ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত আছে। ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। গান্ধী, সুভাষ, নেহরু, আজাদ, আম্বেদকরের আদর্শ ও ত্যাগে গড়া দেশ। আমরা নানা সময়ে আইনের শাসনের প্রশ্নে ভারতের উপমা দিই; কিন্তু সেই দেশ কি দেখছি?
শাসক দল বিজেপি, এমনকি দলের নেতা নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে নানা সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতমূলক বক্তব্য দিলেন। তখন ও দেশের সাংবাদিক, লেখক, প্রগতিশীল বন্ধুদের বললাম, মোদিজি এসব কী বলছেন। অনেকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুনেছি। আবার কেউ কেউ বললেন, ও কিছু না। ভোট পাওয়ার কৌশল। তবে সেটি ছিল অপকৌশল বৈ অন্য কিছু নয়।
বিজেপি জোট সরকার গঠনের পর আরএসএস-সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বলতে শুরু করে-ভারত হিন্দুদের দেশ; এখানে থাকতে হলে হিন্দু হয়ে থাকতে হবে। মোদি সরকার গঠনের পর শুরু হলো ঘর ওয়াপসি বা ঘরে ফেরানোর আন্দোলন। মানে তোমাদের পূর্ব প্রজন্ম হিন্দু ছিল। ভুল করে ঘর ছেড়েছিল, এবার তোমাদের পূর্ব প্রজন্মের প্রায়শ্চিত্ত করে ঘরে ফিরতে হবে। এভাবে উত্তর প্রদেশসহ নানা স্থানে কয়েক হাজার মুসলমান ও খ্রিস্টানকে ধর্মান্তরিত করা হয়; যা কেবল ‘৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের সঙ্গে তুলনীয়। যারা তখন নানা স্থানে হিন্দুদের ধর্মান্তরে বাধ্য করেছিল।
এখন হিন্দুত্ববাদীরা ‘গোমাতা’ রক্ষা আন্দোলনে নেমেছে। তারা গরু রক্ষার নামে মানুষ খুনে দ্বিধা করছে না। বয়োবৃদ্ধ মোহাম্মদ আখলাক থেকে কিশোর জুনেইদ পর্যন্ত বেশ কিছু লোককে গোমাংস ভক্ষণকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করেছে। অনেককে ‘গণধোলাই’ দেওয়া হচ্ছে। তারা রাম রাজত্ব চাইছে। এ কেমন রাম রাজত্ব! কে কী খাবে বা কী পোশাক পরবে তা ঠিক করে দেবে ‘রাম রাজত্বের’ ক্যাডাররা। এ ব্যাপারে ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সঞ্জয় সুব্রামানিয়াম বিবিসিকে বলেন, ‘এটি তিনভাবে দেখা যায়- জাতিগত বা ধর্মীয় দাঙ্গা, উত্তেজিত জনতার দ্বারা সহিংসতা এবং সামাজিক রীতি রক্ষার নামে হত্যাকাণ্ড।’ তিনটিই আইনের চোখে অপরাধ। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, ভারতে মুসলমানরাই গোমাংস খাওয়া শুরু করেনি। ভারতে প্রাচীন যুগেও গোমাংস ভোজন হতো। এ প্রসঙ্গে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারতের অনুবাদক রাজশেখর বসু বইটির ভূমিকায় বলেন, ‘ব্রাম্মণ্যক্ষত্রিয়াদি সকলেই প্রচুর মাংসাহার করত। ভদ্র সমাজেও সুরাপান চলত। গোমাংস ভোজনও গোমেধযজ্ঞে বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রন্থ রচনাকালে তা গর্হিত বলে গণ্য করা হতো।’
হিন্দুত্ববাদীদের তৎপরতা ‘গোমাতা’ রক্ষার মধ্যে থেমে নেই। সম্প্রতি সংঘ পরিবার ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথ, মির্জা গালিব, ফিদা হোসেন আর উর্দু, আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘সংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের কাছে চিঠি লিখে জানিয়েছে, এনসিইআরটির পাঠ্যপস্তকের হিন্দি বই থেকে বাদ দিতে হবে যাবতীয় উর্দু, ফারসি, ইংরেজি শব্দ-কবিতা। আর সেটি হলে কোপ পড়বে গালিবের উপরেও।’ (সংঘের কোপে পাঠ্যপুস্তকের গালিবও: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ জুলাই ২০১৭)। আনন্দবাজার পত্রিকা আরও লিখেছে, ‘রবীন্দ্রনাথ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে বলে মনে করে সংঘ-ঘনিষ্ঠ শিক্ষা-সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস। তাদের মতে, জাতীয়তাবাদী মনোভাবের সঙ্গে খাপ খায় না রবীন্দ্র-চেতনা। তাই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে ন্যাস। সংস্থার প্রধান দীননাথ বাত্রা সম্প্রতি এনসিইআরটিকে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, কেন রবীন্দ্রনাথ বাদ যাওয়া উচিত পাঠ্যপুস্তক থেকে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও দীননাথের কোপে পড়েছেন মির্জা গালিব, পাঞ্জাবি কবি পাশ, চিত্রকর এম এফ হুসেন থেকে রামধারী সিংহ দীনকর। আর পড়ূয়ারা যাতে বিশুদ্ধ হিন্দি শিখে সে জন্য পাঠ্যপুস্তক থেকে সমস্ত উর্দু, ইংরেজি বা আরবি শব্দ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন দীননাথ।’ (সংঘের কোপে এবার রবীন্দ্রনাথ; আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ জুলাই ২০১৭)।
এ সবকিছু দেশটিকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রের অংশ। দীননাথ বাত্রাদের অজানা থাকার কথা নয়; উর্দু ভারতে বিদেশি ভাষা নয়, এটি ভারতীয় ভাষা। মোগল আমলে হিন্দুস্তানি ভাষায় ফারসি ও আরবি শব্দ প্রবেশ করেছিল। আরবি-ফারসি শব্দের প্রবাহ মুক্ত ছিল না ভারতের অন্যান্য ভাষাও। সে যাই হোক, আরবি-ফারসি শব্দে হিন্দুস্তানি ভাষাটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিল ‘জবান-ই হিন্দ বা হিন্দুস্তানি’ পরিচয়ে। হিন্দু-মুসলমান বিরোধে ভাষাটি দুটি শাখায় পরিণত হয়। তবে ভাষা দুটি যমজ বোনের মতো গলাগলি ধরে থেকেছে। একদা ভাষা দুটির মধ্যে দূরত্ব বানারশ ও আলীগড়ের পণ্ডিতরা। বানারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতরা হিন্দি থেকে যথেচ্ছ আরবি-ফারসি শব্দ বিতাড়ন করেছেন। অপরদিকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দুকে খুশিমতো সংস্কৃতমুক্ত করেছেন। এসব ছিল ভাষার অঙ্গহানির হীন প্রয়াস। তবে এতে দুই ভাষার জনগোষ্ঠী তেমন সাড়া দেন না। শব্দ ব্যবহারে তারা পণ্ডিতের বিধান মানেননি। নতুন করে আবার সেটি চাইছে হিন্দুত্ববাদীরা। আমি বুঝতে পারি না, হিন্দি সাহিত্য বা বলিউডের সিনেমা থেকে দিল, মহব্বত, দিওয়ানা ইত্যাদি বাদ দিলে কী দশা হবে? সেটি না হয় বাদ গেল। ফারসি ভাষা থেকে আগত শব্দ হিন্দু ও হিন্দির বিকল্প কী হবে!
রবীন্দ্র-জ্যোতি ভারত বা উপমহাদেশকে যতটুকু আলোকিত করেছে, এমনটি আর কারও দ্বারা হয়েছে বলে কেউ দাবি করবেন না। সঙ্গত কারণে তিনি হিন্দু মৌলবাদের (মুসলিম মৌলবাদেরও বটে) চোখের কাঁটা। তাদের চোখের কাঁটা নেহরুও। জানি না, সে কারণেই কি ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ শপথের পর সংসদের সেন্ট্রাল হলের সভায় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দীনদয়াল উপাধ্যায়, প্যাটেলের নাম বললেও আধুনিক ভারতের নির্মাতা নেহরুর নাম উচ্চারণ করেন না।
হিন্দুত্ববাদীরা আজ ক্ষমতার আশ্রয়ে। তাদের নিশানা কেবল ‘গোমাতা’ রক্ষা নয় কিংবা রবীন্দ্রনাথ, নেহরু, চিত্রকর ফিদা হোসেন, যুক্তিবাদী লেখক কালবুর্গি বা আখলাক-জুনাইদ নয়। আসল নিশানা বহুত্ববাদী ভারত, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। এসবের বিরুদ্ধে ভারতের নানা স্থানের সাংবাদিক-শিল্পী-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। অনেকে সরকারের এই ভেদনীতির প্রতিবাদে রাষ্ট্রীয় খেতাবও বর্জন করেছেন। কিন্তু বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ নেই। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্যাম্পেইনে উদ্বুদ্ধ হয়ে গত ২৮ জুন ‘নট ইন মাই নেম’ স্লোগান ধারণ করে কলকাতা, দিলি্ল, পাটনা, পুনা, লক্ষেষ্টৗ, এলাহাবাদ, চণ্ডীগড়, জয়পুর, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, কোচি প্রভৃতি শহরে নেমে এসেছিল নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কি পারবে অপশক্তিকে রুখতে_ সেটি আজ বড় প্রশ্ন।
লেখক
আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক
ask_bangla71@yahoo.com