আবু সাঈদ খান : ষোড়শ সংশোধনীর ওপর রায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা ছাপিয়ে আলোচিত হচ্ছে সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ। ইতিপূর্বে এক লেখায় উচ্চ আদালতে বিচারক অপসারণে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের অপরিহার্যতা সম্পর্কে বলেছি_ এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা করব না। বরং ষোড়শ সংশোধনীর ওপর পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা নিয়ে কিছু বলতে চাই।
প্রধান বিচারপতি আমাদের গৌরবদীপ্ত মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে বলেছেন, “আমরা এখন মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করছি। অথচ আমরা দম্ভ ও অজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি; যা আমাদের অতীতের সংহতি ও ‘আমরা’বোধের জন্য হুমকি। কোনো জাতি বা দেশ এক ব্যক্তির দ্বারা বিনির্মাণ হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাস করতে চাই, তাহলে আমাদের আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ ও আমিত্ব ছাড়তে হবে। এক ব্যক্তি সবকিছু করেছেন এমন ভাবনামুক্ত থাকতে হবে।” এ বক্তব্যকে স্বাগত জানাই।
আমাদের সামনে এগোতে হলে একটি সামষ্টিক বা গণতান্ত্রিক চেতনা অপরিহার্য। আজ রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভারসাম্যের ক্ষেত্রে যে ব্যত্যয় দেখা দিয়েছে, তার মূলেও সামষ্টিক উপলব্ধির অভাব। আজ ক্ষমতাসীন দল বিরোধী শক্তির ভূমিকা স্বীকার করছে না; বিরোধী দলও সরকারের ভালো কাজের মূল্যায়ন করছে না, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। দেশের সামগ্রিক কল্যাণে এ প্রবণতার অবসান হতে হবে। এ প্রসঙ্গে আমি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের উল্লেখ করতে চাই। এখনও বিএনপিসহ তাদের সমমনারা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যথাযথ মর্যাদা দিতে নারাজ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও তার ঘরানার বাইরে কাউকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। অথচ একাত্তরের মুত্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ; যা নানা মত-পথের, শ্রেণি ও পেশার নরনারীর অবদানে সমুজ্জ্বল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর মহানায়ক; তবে অন্য সব নায়ককে মূল্যায়ন করতে হবে, যথাযোগ্য স্থান দিতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে সেই তৃণমূলের জনতাকে_যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রাণশক্তি।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে দু’বার সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তার ভাষায় বাংলাদেশ তখন ‘ব্যানানা রিপাবলিকে’ পরিণত হয়েছিল। সে সময়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রতিস্থাপন প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাহাত্তরের সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবুও এটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এভাবেই ধর্মীয় আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এ বিধানটি ১৯৭৯ সালে সামরিক সরকার সংবিধানে প্রতিস্থাপন করেছিল; পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সেটির বৈধতা দিয়েছে। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ‘৭২-এর সংবিধানের চেতনা সমাহিত হয়েছে।’ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার যে সংগ্রাম চলছে; প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে সেই ধারাই যেন বেগবান হলো। মুক্তিযুদ্ধের সব দাবিদারের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল_ কোন পথে চলবেন, একাত্তরের পথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ গড়বেন, না আপসের চোরাগলিতে একাত্তরের অর্জনকে বিসর্জন দেবেন।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে দেশের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা হলো_ ‘মানবাধিকার বিপন্ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণহীন, সংসদ অকার্যকর, কোটি কোটি লোক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা। উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধের ধরনও বদলে যাচ্ছে। ফলে জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা মোকাবেলায় সমর্থ হচ্ছে না। ফলে সমাজ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এখানে ভালো লোক স্বপ্ন দেখতে পারছে না। কিন্তু খারাপ লোকেরা লুটপাটে বেসামাল।’ এটি বাস্তব চিত্র। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল একে অন্যকে দোষারোপ করতে পারে। তবে কারও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এটি তো একদিনে হয়নি। সব শাসকই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বিচার বিভাগেরও অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘কেবল বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্রের আপেক্ষিক স্বাধীন অঙ্গ, যেটি ডুবন্ত অবস্থায় নাক জাগিয়ে রেখেছে। তবে বিচার ব্যবস্থাও এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না।’
প্রধান বিচারপতি রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এতে টাকার খেলার কথা বলা হয়েছে। এটি নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও বলেছেন, সংসদে এখন ৬০ ভাগ কোটিপতি। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, তিনি যখন ‘৭০ সালে সংসদে এসেছিলেন, সেদিনের সংসদের সঙ্গে আজকের সংসদের কত পার্থক্য! তখনকার সংসদে বেশিরভাগই ছিল সংগ্রামের রাস্তা থেকে ওঠে আসা মানুষ। বেশিরভাগ সাংসদের গাড়ি ছিল না, বাড়ি ছিল না, ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছিল না। ছিল দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। আর রাজনীতি আজ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এখন ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয় ১০০ কোটি বা ১০০০ কোটি টাকা পাওয়ার জন্য। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি উদ্বিগ্ন। আমার বিশ্বাস, এই উদ্বেগ থেকে দূরে নন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাই রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির বিবেকপ্রসূত মন্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখলে উত্তরণের পথ পাওয়া যাবে। তা না করে এটি অগ্রাহ্য করলে বা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। তা কারও অবোধগম্য নয়। সঙ্গতভাবেই এ প্রশ্ন করা যায়, সংসদ যদি রাজনীতিকদের হাতে না থেকে আমলা ও টাকাওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সেই সংসদের কাছে বিচারক অপসারণের মতো বিষয়টি ন্যস্ত করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন এসে যায়, কোটিপতিদের কি নির্বাচন করার অধিকার নেই? নিশ্চয়ই আছে। তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে; হঠাৎ করে মনোনয়ন খরিদ বা বাগিয়ে নয়।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের আরেকটি ক্ষেত্র সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। সংসদে ৭০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্তির কারণ আমাদের জানা আছে। সেটি হলো পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতা। তখন হর্স ট্রেডিংয়ের মতো সাংসদরা বেচাকেনা হতো, সকাল-বিকেল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটত। সে অভিজ্ঞতার আলোকে ‘৭২-এর সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করে ফ্লোর ক্রসিংয়ের সুযোগ রহিত করা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন এর নেতিবাচক দিকগুলো কারও না বোঝার কথা নয়। এ বিধানে কেবল সরকারের প্রতি আস্থা-অনাস্থার ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য হচ্ছে। ফলে সাংসদের স্বাধীন চিন্তার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেছেন, ‘সংসদ সদস্যদের যদি সন্দেহ করা হয়, তাহলে কী করে তাদের ওপর উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের মতো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ন্যস্ত করা যায়? এই অনুচ্ছেদের মর্মবাণী হচ্ছে, নির্বাচিত সাংসদরা মনোনয়নদাতা দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। এ বিধানে তারা দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের কাছে জিম্মি।’ এ ব্যাপারে আমার মনে হয়, এটি সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারের প্রতি আস্থা-অনাস্থার ক্ষেত্রটি রেখে অন্যান্য ইস্যুতে ভিন্ন মতের সুযোগ অবারিত করা যেতে পারে।
প্রধান বিচারপতি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এ পর্যবেক্ষণকে মনে হয়েছে_ সমাজের নানা মহলে উচ্চারিত বিষয়গুলোর সারসংক্ষেপ। তবে এটি প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে উচ্চারিত হওয়ায় আরও গুরুত্ববহ হয়ে উঠল। তবে দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের রাজনীতিতে রায়-পর্যবেক্ষণ মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি নেই। আমার মনে হয়, কেউ জবাবদিহির ঊধর্ে্ব নয়। রায়ের ওপর গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারে। তবে আদালতের নির্দেশ মানতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। আর তার ব্যাখ্যাদাতা সর্বোচ্চ আদালত।
সাংবিধানিক অধিকারবলে আদালত দিকনির্দেশনাও দিতে পারেন। তবে সবকিছুরই বাস্তবায়ন ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের; যার চালিকাশক্তি রাজনীতি। তাই দেশের সামগ্রিক পরিবর্তনে রাজনীতিকে অগ্রণী হতে হবে। আর সে জন্য রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার বিকল্প নেই। রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে, কালো টাকা ও পেশিশক্তির কব্জা থেকে রাজনীতি বাঁচাতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। মনে রাখা দরকার, রাজনীতি ব্রত, ব্যবসা নয়।
লেখক
আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক

ask_bangla71@yahoo.com