bnpযেদল বা জোট নির্বাচনে জিতবে, সেই বিজয়ী শক্তি পাঁচ বছরের জন্য দেশ চালাবে_ কথাটি সত্য। একইভাবে এও সত্য যে, ওই মেয়াদে রাজা-বাদশাহর মতো সরকারের যা ইচ্ছা তা-ই করার সুযোগ নেই। সরকারকে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা গ্রহণ থেকে শুরু করে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। সংসদের বাইরে নাগরিক সমাজের কাছেও জবাবদিহি করতে হয়। এটিই গণতান্ত্রিক বিধান। এ বিধান অনুসরণে অতীতের মতো বর্তমান সরকারও যে আদৌ আন্তরিক নয়, তার প্রমাণ অঢেল।
বিরোধী দলকে সংসদে ফেরার নামকাওয়াস্তে আহ্বান জানানো হলেও আক্রমণের ভাষা শুনে মনে হয়, বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রাখতেই যেন সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এ লেখায় সরকারের নয়, প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েই কথা বলতে চাই।
চার দলের সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী দলের মূল শক্তি বিএনপি। \’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে সরকার গঠন করে আসছে। বর্তমান সংসদে আসন সংখ্যা কম হলেও বিএনপির গণভিত্তি রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটব্যাংকে তেমন পার্থক্য নেই। দলনিরপেক্ষ ভোটের কারণে কখনও আওয়ামী লীগ এবং কখনও বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করছে।
১৯৭৫-এর নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসীন হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। তখন সেনাছাউনিতে দলটির জন্ম হয়েছে_ এমন অপবাদ থাকলেও স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। গণতন্ত্রের লড়াইয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া \’আপসহীন নেত্রী\’র তকমা লাভ করেন। দলটির গুণগত পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়। জিয়াউর রহমান \’মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার ভাই ভাই\’ তত্ত্ব দিয়ে দলটির বুনিয়াদ গড়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি দলের পতাকাতলে মুসলিম লীগ, পিডিপির নেতাদের জড়ো করেন। চিহ্নিত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী এবং এখন যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজাকার আবদুল আলীমকে মন্ত্রী করেন। স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে সেই দলের তরুণ কর্মীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল_ \’মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার।\’ দলের নেতারাও বক্তৃতা-বিবৃতিতে একাত্তরের চেতনার কথা বলতে শুরু করেন। তখন আবদুল মতিন চৌধুরী ছাড়া মুসলিম লীগের কোনো নেতা বিএনপিতে ছিলেন না। আমার মনে পড়ে, একবার বিএনপির মিছিল থেকে \’মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার\’ স্লোগান হচ্ছে। মিছিলে পুলিশ হামলা করায় মতিন চৌধুরী পড়ে গিয়ে আহত হন। তখন আন্দোলনে শরিক অন্য এক দলের নেতা আহত মতিন চৌধুরীকে লক্ষ্য করে রসিকতা করেছিলেন_ মতিন সাহেব কি পুলিশের ডাণ্ডা, না মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ারে আক্রান্ত হলেন! মতিন সাহেব রসিকতা বুঝতে পেরে মৃদু হেসেছিলেন। এরশাদ আমলে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধেও বিএনপির নেতাকর্মীরা এগিয়ে এসেছিলেন। খালেদা জিয়াও দাঙ্গাবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
\’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই বিএনপি সেই বিএনপি নয়, বিএনপি এখন রাজপথের সংগ্রামে উত্তীর্ণ। আমাদেরও মনে হয়েছিল, দলটি গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা খানিকটা ধারণ করেছে। কিন্তু ১৯৯১ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে দলটি মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারেনি। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হলে বিএনপি সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতি নূ্যনতম শ্রদ্ধা দেখায়নি। এমনকি শহীদ জননীসহ আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা দিতেও এতটুকু কুণ্ঠিত হয়নি।
২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ মৌলবাদীদের সঙ্গে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে বিএনপি। নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-ধর্ষণ-লুটপাটের কলঙ্কিত ঘটনার জন্ম দেয়। জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী করা হয়, যা একাত্তরের বিজয়ী জনতাকে নতুন করে আহত করে। তবে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এ জন্য কি বিগত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়েছিল? না, কেবল এটি নয়_ দুর্নীতি, দুঃশাসন, হাওয়া ভবনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, লুটপাটের পাশাপাশি রাজাকার পোষণ নীতিও যে পতনের অন্যতম কারণ, তা অস্বীকার করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, \’নৌকায় ভোট দিলে আবার উলুধ্বনি শোনা যাবে কিংবা বাংলাদেশ হিন্দুস্তানের দখলে যাবে\’_ খালেদা জিয়ার এই উগ্র ভারতবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের কারণে নতুন প্রজন্মসহ বিবেকবান মানুষের সমর্থন হারিয়েছিল দলটি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপির এ ধরনের সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা শুনিনি। বরং খালেদা জিয়া সম্প্রতি ভারত সফর করে ফেরার পর তার বক্তব্যে অপ্রয়োজনীয় ভারতবিরোধিতা পরিহারের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার লক্ষ্য করছি। তিনি রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনার পর সেখানে গিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্বও দিয়েছেন। এসব থেকে মনে হয়, বিএনপি হীনস্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা, অহেতুক ভারতবিরোধিতার নীতি পরিহার করেছে। কিন্তু জামায়াতের প্রতি তোষণনীতি যেভাবে অব্যাহত রেখেছে, তাতে পরিবর্তনের কোনো আভাস মেলে না।
ইতিপূর্বে অনেকদিন বিএনপি জামায়াতসহ মৌলবাদী দলগুলোকে সঙ্গে না নিয়েই এগিয়েছে। রোডমার্চসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ব্যাপক সাড়াও ফেলেছিল। দলটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৮ দলে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করায় তা আবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। দেশের সচেতন জনগণের বড় অংশ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। অতএব, তা থেকে উত্তরণের জন্য দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনায় একটি নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছে। কিন্তু আন্দোলনে জামায়াতের সহিংস ভূমিকা এক ধরনের বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে। জামায়াতের কর্মীরা ওইসব কর্মসূচিতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রতিকৃতি বহন করছে। যুদ্ধাপরাধের ট্রাইব্যুনাল বাতিলের স্লোগানও দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া তারা বারবার চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যানবাহন ভাংচুর করছে, পুলিশের ওপর হামলা করছে। সেই দায়ও ১৮ দলের ওপর এসে পড়ছে।
এখন এটি বিএনপির উপলব্ধি করার বিষয় যে, সময় বদলেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি আজ জাতীয় দাবিতে পরিণত। নতুন প্রজন্মসহ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের গ্গ্নানি থেকে মুক্ত হতে চাইছে। এ পরিস্থিতিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দলের সঙ্গে বিএনপির পথচলা জাতি সমর্থন করে না। কেউ উদাহরণ দিতে পারেন, বিগত দিনে আওয়ামী লীগও জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। ১৯৯৬-তে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। খেলাফত মজলিসের সঙ্গে শরিয়া আইন প্রণয়নের সমঝোতা চুক্তি করেছে। অথবা আজ স্বৈরাচারী এরশাদকে নিয়েও পথ চলছে। এগুলো নিন্দনীয় এবং ভুল। এসব ভুলের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে বিএনপিও জামায়াত তোষণনীতি অব্যাহত রাখবে, তাদের প্রশ্রয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বানচালের চেষ্টা করবে, তা হতে পারে না।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান সুস্পষ্ট নয়। দলটি বলছে, তারাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু) রাজাকারের বিচারের রায় ঘোষণার পর সর্বস্তরের মানুষ যখন সন্তোষ প্রকাশ করেছে, তখন বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। উপরন্তু বিএনপি নেতারা তোতা পাখির মতো একটি বুলি আউড়িয়ে চলেছেন, বিচার হতে হবে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের। এ কথা তারা অন্য কোনো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বলছেন না। তারা সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজ কোর্ট, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের মান নিয়ে কথা বলছেন না। কেবল আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মান নিয়ে তাদের অব্যাহত বক্তব্য রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপকৌশল কি-না, সে প্রশ্ন এসে যায়।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, কেবল গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদরা ব্যক্তিগতভাবেই যুদ্ধাপরাধ করেননি, জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই সে অপরাধ করেছে। অতএব জামায়াতও যুদ্ধাপরাধী দল, একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর। বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের রায়েও তা উলি্লখিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ঘাতক দলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলা কি সমর্থনযোগ্য?
বিএনপিতে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আছেন। খালেদা জিয়া একাত্তরের এক বীর নায়কের পত্নী। সেই দল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন আরও দৃঢ় অবস্থান নেবে, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে নিয়ে আর পথ চলবে না, সেটিই আজ প্রত্যাশিত।