নাসির আহমেদ-এর রিভিয়্যূ

আবু সাঈদ খান সম্পাদিত
মুক্তিযুদ্ধে দলিলপত্র: ফরিদপুর
প্রকাশক: সাহিত্য বিকাশ
প্রচ্ছদ: মাহবুবুল হক
দাম: ২২০ টাকা

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এমন এক অবিস্মরণীয় গৌরবগাথা, এমন অসীম ত্যাগ আর মহত্ত্বের অজস্র ঘটনায় বাঁধা, যার শুরু থাকলেও শেষ নেই। সেই অনন্য ইতিহাসের অজস্র উপকরণ এখনও ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে। কতটুকুইবা সংগৃহীত হয়েছে দলিলপত্র হিসেবে!  বহু দলিল আছে যা সংগ্রহ আর সংরক্ষণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা ক্রমেই সমৃদ্ধ আর পহৃর্ণাঙ্গ করে তুলতে পারি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করেছেন- এমন লেখক এতই কম যে, হাতেগোনা ক’জন মাত্র; যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যেমন পাওয়া যায় না নির্ভরযোগ্য লেখক, তেমনি দলিল- দস্তাবেজ সংগ্রহেও পাওয়া যায় না প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছাপ।  অথচ এসব আঞ্চলিক ইতিহাস আর দলিলপত্রই হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় ইতিহাসের পহৃর্ণাঙ্গ উপাদান। ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর : দলিলপত্র’ বইটি পড়তে পড়তে এসব ভাবনা জাগল। কারণ এ বইটির সম্পাদক ও দলিলপত্রের সংগ্রাহক সাংবাদিক আবু সাঈদ খান ওই হাতেগোনা স্বল্পসংখ্যক লেখক-মুক্তিযোদ্ধার অন্তর্ভুক্ত। ইতিপহৃর্বে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিশেষ করে ‘উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ : উপেক্ষিত জনগণ’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর’ বই দুটি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর’ গ্রন্থে ওই জেলার মুক্তিযুদ্ধের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, সেই ইতিহাসেরই প্রামাণ্য উপকরণ ও দলিল-দস্তাবেজ ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর: দলিলপত্র’ বইটি। নানা কারণে এ বইটিকে গুরুত্বপহৃর্ণ বিবেচনা করবেন মুক্তিযোদ্ধা এবং সচেতন পাঠক। কারণ এক সময়ের ফরিদপুর জেলার শীর্ষস্থানীয় ছাত্রনেতা ও পরবর্তীকালে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক তার একাত্তরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকেই নিজ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থিত করেছিলেন। সেই গ্রন্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রাকপ্রস্তুতি থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনীতিক, ছাত্র তরুণ মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাবিরোধীদেরও বহু তৎপরতার বর্ণনা হাজির করেছেন। এই দলিলপত্র যেন সেই বক্তব্যেরই সচিত্র তথ্যপ্রমাণ। এসব তথ্যপ্রমাণকে দুর্লভ বললেও অত্যুক্তি হয় না। ফরিদপুর জেলার বিভিু স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য দলিল, মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্র, রাজাকার ও পাকবাহিনীর এদেশীয় দোসর শান্তি কমিটির চিঠিপত্র, রাজাকার আলবদরদের সরকারি তালিকা- যা জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর থেকে যুদ্ধ চলাকালেই সংগৃহীত। বিশেষ করে, রাজাকারদের তালিকা এবং তাদের বিভিন্ন অপকর্মের দালিলিক প্রমাণ, এমনকি সরকারি টাকা তোলার ভাউচার পর্যৗ আবু সাঈদ খান এমন শ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে সংগ্রহ করেছেন যা সত্যি প্রশংসনীয়। এ কাজটি এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে, মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার উপকরণ হিসেবে যা দেশের অন্যান্য জেলার ইতিহাস রচয়িতাদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে নিজ নিজ জেলার প্রামাণ্য দলিল সম্পাদনায়।
শান্তি কমিটির একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ফরিদপুর জেলা পরিষদের এক সময়ের কর্মচারী গণেশ গুহর কাছ থেকে সংগ্রহের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আবু সাঈদ খান পাঠকদের বুঝবার সুযোগ দিয়েছেন যে, একাত্তর কী ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়েছিল নিরীহ মানুষও। বহু লোকের প্রয়াস আর সহযোগিতা যেমন মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, তেমনি দলিলপত্র সংগ্রহ আর সংরক্ষণেও তাদের ভূমিকা উজ্জ্বলতর।
মোট ৩টি অধ্যায়ে ৯টি পরিচ্ছেদে সম্পাদক এমনসব তথ্য-উপাত্ত আর দালিলিক প্রমাণ হাজির করেছেন, যা আমাদের ইতিহাসের এক মহৃল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে কালে কালে। প্রথম অধ্যায়ে নির্দেশনামা, চিঠিপত্র, ডায়েরি ও অন্যান্য। দ্বিতীয় অধ্যায়ে সাপ্তাহিক ‘উত্তাল পদ্মা’ (আবু সাঈদ খান সম্পাদিত ও কলকাতা থেকে একাত্তরে প্রকাশিত), ‘উত্তাল পদ্মা’ সমীক্ষা এবং তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে ফরিদপুর জেলা শান্তিকমিটির সদস্যদের তালিকা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপনির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা, অপরাধ ও দালাল আইনে দায়েরকৃত মামলায় অভিযুক্তদের তালিকা।
এসব শিরোনাম থেকেই পাঠক আন্দাজ করতে পারবেন যে কী দারুণ দুর্লভ সব দলিলাদি সংকলিত এখানে। তবে বইটির সবচেয়ে বড় গুণ, এত তথ্য আর দলিলপত্র সত্ত্বেও নিছক গবেষণা-ভারাক্রান্ত, বরং অনেকটা ফিকশনধর্মী অসংখ্য বাস্তব ঘটনা, যা আনন্দ আর শোকে, গৌরবে আর গ্লানিতে আপ্লুত করবে পাঠকদের। সত্যি এ এক ভিন্নস্বাদের সংগ্রহ। সংরক্ষণযোগ্যতার দাবিও রাখছে নিশ্চিতভাবেই।
(৩১ জুলাই ২০০৯ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত। )