অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভূমিকা

বিকল্প চিন্তা বিকল্প রাজনীতি


আবু সাঈদ খানকে আমি জানি রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে; এখনও তিনি তা-ই আছেন, আমার বিশ্বাস থাকবেনও। এর মধ্যে যে নতুন ঘটনা ঘটেছে, তা হলো তিনি লেখা শুরু করেছেন। এটি তার প্রথম প্রবন্ধের বই। আমরা আশা করব, তিনি আরও লিখবেন।
সক্রিয় রাজনীতিতে যারা আছেন তারা লিখেন না, এমনকি বড় নেতাদের অনেকের কাছ থেকেই আমরা আত্মজীবনী পাইনি, পেলে ভালো হতো।  শেখ মুজিবুর রহমান আত্মজীবনী লিখতে চেয়েছিলেন, সময় পাননি, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী উৎসাহী ছিলেন না লেখায়, একে ফজলুল হকও উৎসাহী ছিলেন না এ বিষয়ে। তারা লিখলে রাজনীতির অন্দরমহল সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যেত, আমরা রাজনৈতিক বিতর্ক, কিছু রহস্য বুঝতে পারতাম।আবু সাঈদ খান রাজনীতিতে এসেছেন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পথ ধরে। সে রাজনীতি ছিল জাতীয়তাবাদী। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে একটা সীমা আছে তা নানা দেশে ধরা পড়েছে, ধরা পড়েছে আমাদের দেশেও। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এখন কী? জাতীয়তাবাদীরা এখন কী করবে? এই প্রশ্ন একাত্তরের শেষে উঠে এসেছিল। জাতীয়তাবাদীদের একাংশ গেল লুণ্ঠনের দিকে; আরেক অংশ দেখল নতুন পথ ছাড়া এগোনো যাবে না; তারা ধ্বনি তুলল সমাজতন্ত্রের। জন্ম হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের। আবু সাঈদ খান এ ধারার রাজনীতিতে ছিলেন, এখনও আছেন।
এখন তো জাসদ আগের স্থানে নেই। তবে জাসদের অনেক কর্মীর মধ্যে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নটি আছে। সমাজতন্ত্রের ওই স্বপ্ন ছিল বলেই ছাত্রলীগের অনেক কর্মী জাসদে যোগ দিয়েছিল। ছাত্রলীগের বাইরে বহু কর্মীও ছুটে এসেছিল, মুক্তির লক্ষ অর্জন করবে বলে। এই বইয়ের প্রবন্ধগুলো বলে দিচ্ছে সাঈদ সমাজতন্ত্রের স্বপ্নটিকে লালন করে। তিনি আওয়ামী লীগে যাবেন না, বিএনপিতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তার লক্ষ বিকল্প ধারা। সেই রাজনীতির পক্ষে লিখেছেন তিনি। আগামী দিনে আরও লিখবেন।
এ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে সমসাময়িক রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ ও সমস্যার কথা এসেছে। এ সমস্যাগুলো আমাদের জানা। সমাধানের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে নেতৃত্বের। যে কথাটা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন; কিন্তু সেই নেতৃত্ব আসবে কী করে, কোথা থেকে? এটি হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি জিজ্ঞাসা। এ জিজ্ঞাসার জবাব সাঈদের বইতে আছে, নেতৃত্ব আসবে আন্দোলনের ভেতর থেকে। সবক’টি প্রবন্ধেই একথা বলা হয়েছে, কখনও স্পষ্টভাবে, কখনও অস্পষ্টভাবে।
সারকথা ওটাই। বিকল্প রাজনীতি চাই, সে রাজনীতি বাম দিক থেকেই আসবে এবং আসবে আন্দোলনের ফলে। আবু সাঈদ খানের ভাষা প্রাঞ্জল এবং অঙ্গীকার স্পষ্ট। এটি যে একটি জরুরি বই সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পাঠকের পড়তে ভালো লাগবে, যেমন আমার লেগেছে।