Home » কলাম » সাংবাদিকের কলম কতটুকু স্বাধীন?

 
 

সাংবাদিকের কলম কতটুকু স্বাধীন?

 
 

Subjects

Tags

buet Chittagong Chittagong Hill Tracts Chittagong Hill Tracts Peace Accord communication education medical Padma Bridge Peace Accord road student politics train ইতিহাস উল্টা হাওয়ায় এক সাইকেল আরোহী এ কেমন কর্তব্যবোধ! এরশাদ কার কাজ কতটুকু কালাকাল গণতন্ত্র গণমুখী চাই প্রকৃতি ও মানববান্ধব উন্নয়ন চিন্তা জনগণ তার হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় দর্শন দলিল দি জুবলী হোটেল :সময়ের মানচিত্র নীরব রায়ে ফুটল হুল নূর হোসেন ফরিদপুর বাংলাদেশ বিকল্প ভিডিও মহাজোট সরকারের চার বছর মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি রুগ্ণ গণতন্ত্র বলিষ্ঠ পেশিতন্ত্র সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে ভাবুন সংঘাত সমাজ রূপান্তরের অভিযাত্রী সমাধান স্বাধীনতা হিন্দুত্ববাদীদের নিশানা ধর্মনিরপেক্ষতা ১৯৭১
আবু সাঈদ খান : একবার একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল_ আমি যা বলতে বা লিখতে চাই, তা পারি কি-না। বললাম_ না, সব কথা বলতে পারি না। পাল্টা প্রশ্ন, আমি কোনো হুমকির মধ্যে আছি বা হুমকি পেয়েছি কি-না। বললাম_ না। তবে কেন সব কথা বলতে বা লিখতে পারছি না_ ছিল তৃতীয় প্রশ্ন। সে দিন যা বলেছিলাম, তা আজ নতুন করে বা খানিকটা বিস্তৃতভাবে বয়ান করতে চাই।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গণতান্ত্রিক পরমতসহিষ্ণু আবহ দরকার। যেখানে ভিন্ন মত প্রকাশে কোনো বাধা থাকে না। আমাদের সমাজে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বা মন্তব্য যার বিপক্ষে যায়, তখন সে-ই খৰহস্ত হয়। পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, মাস্তান, মাফিয়া চক্রসহ বিভিন্ন মহলের সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলার ঘটনা ঢের। একবার এক সাংবাদিককে পুলিশ পেটাচ্ছিল আর বলছিল, সাংবাদিক মারলে কী হয়? হয়তো কিছু হয় না। কেবল সাংবাদিকদের বেলায়ই না, দেশের নারী-শিশুসহ অনেক হত্যা-গুম-হামলার বিচার হচ্ছে না। আমাদের চোখের সামনে ভাসছে সাগর-রুনি, খুলনার হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা, যশোরের মাজেদুর রহমান, সাইফুল আলম মুকুল, ফরিদপুরের গৌতম দাস, শাহজাদপুরের আবদুল হাকিম শিমুলসহ অনেক সাংবাদিকের মুখ। কয়েক ডজন ঘটনার মধ্যে গৌতমসহ দু-একটি মামলার অগ্রগতি আছে। অবশিষ্ট মামলাগুলো ফাইলবন্দি। সাগর-রুনি হত্যার পর সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃত খুনিদের খুঁজে বের করার কথা বলেছিলেন, গ্রেফতার করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেটি ছিল ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনা। তারপর থেকে একের পর এক আশ্বাস শুনেছি। কিন্তু এতদিনেও মামলাটির কূলকিনারা হলো না।
এসব হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ দায় নেই। তবে বেশকিছু ঘটনায় খুনিরা ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট। ফরিদপুরে ২০০৫ সালে নিহত সমকালের ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাসের হত্যাকারীরা ছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের আশ্রিত। আর সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল হত্যার অভিযুক্ত হালিমুল হক মীরু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র। ক্ষমতার বরপুত্র ও অর্থবানদের সঙ্গে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তারপর আছে নানা জটিলতা। গৌতমের মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা ভুলবার নয়। সরকারের নিয়োগকৃত পাবলিক প্রসিকিউটর থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে ‘সন্তুষ্ট’ করে মামলাটি ত্বরান্বিত করতে হয়েছে।

যখন সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের নিশানা হয়, তখন আর নিষ্কৃতির সুযোগ থাকে না। আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের জন্য কখনও সুদিন ছিল না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও নানা হয়রানিমূলক আইন ছিল, সেন্সরের খাঁড়া ছিল। স্বাধীনতার পরও তা থেকে মুক্ত নয়। হামলা-মামলা সব সরকারের আমলেই ঘটেছে। এখনও ঘটছে। দেশের রাজনীতির প্রবণতা ক্ষমতায় থাকলে সাংবাদিকদের হয়রানি করে। বিরোধী দলে থাকলে সাংবাদিকদের কাছে আশ্রয় খোঁজে। তবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থাকাকালে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট সংশোধন করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর ফলে সংবাদপত্রের ওপর থেকে খাঁড়া সরলেও সাংবাদিকদের মাথার ওপর তা এখনও ঝুলছে। সাংবাদিকদের ফৌজদারি দণ্ডবিধি ৫০০, ৫০১ বা ৫০২ ধারায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সংবাদ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধের মামলাকে ফৌজদারি দণ্ড থেকে রেহাই দিয়ে দেওয়ানি বিরোধে রূপান্তরের দাবিটি দীর্ঘদিনের; কিন্তু সরকার তা এখন পর্যন্ত আমলে নিল না। এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর আইন_ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা। এ ধারায় আছে_ ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তি সংগঠনের মাধ্যমে ব্যক্তি বা কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’

সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, মিথ্যা ও অশ্লীলের সংজ্ঞা কী, তা এ আইনে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে এই আইনের অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। যেটি ব্যবহৃত হয়েছে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের ক্ষেত্রেও। প্রবীর নিরাপত্তা না পেয়ে ফেসবুকে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তাকে নিরাপত্তা দেওয়া ছিল রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেটি না দিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এটি যে আইনটির অপব্যবহার তা নিয়ে সংশয় নেই। চলতি বছরে আইসিটি অ্যাক্ট ৫৭ ধারায় ২০টির ওপর মামলা হয়েছে।

আইনটি ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে প্রণীত হয়। ২০১৩ সালে বর্তমান সরকার এটিকে সংশোধন করে ১০ বছরের স্থলে ১৪ বছর ও অনূ্যন ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান করেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার_ কেউ যখন মুদ্রণ সংস্করণে লিখবেন, তখন এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ বা ৫০২ ধারায় মামলা হবে। যার শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। আর সেই ব্যক্তি অনলাইনে লিখলে আইসিটি আক্ট ৫৭ ধারায় মামলা হবে, যাতে শাস্তি সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর কারাদণ্ড আর এক কোটি টাকা জরিমানা। এক মুল্লুকে দুই আইন! আমি জানি না আমার লেখা কেউ অনলাইনে তুলে দিলে কার বিচার হবে _ আমার না যিনি তুলে দিলেন।

৫৭ ধারা নিয়ে মন্ত্রীদের দুই ধরনের বয়ান শুনছি। মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলছেন, আইনটি থাকছে, কিন্তু এর অপব্যবহার হবে না। অপর বক্তব্য, এটি থাকছে না। আইনটি না থাকলেও ডিজিটাল থাবা থেকে সাংবাদিকরা রক্ষা পাবেন বলে মনে হয় না।

সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া করেছে। এটি নিয়ে ২১ জুলাই সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আইনটির ১৯ ধারায় ৫৭ ধারার ছায়া পড়েছে। জানি না, ৫৭ ধারা বাতিল করে এটিকে অন্যভাবে নিয়ে আসার কৌশল কি-না। খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৩-এর ‘এফ’ ধারাটিও ভেবে দেখার বিষয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতির পিতা সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণাকে অপরাধ বলে গণ্য হবে। এর ফলে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। আমাদের ভুললে চলবে না, একই ঘটনার নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে, বিতর্কও আছে, তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং সব মতকে স্বাগত জানানো উচিত, যাতে নানা মতের মিথস্ক্রিয়ায় ইতিহাস সমৃদ্ধ হতে পারে ।

এটি স্বীকার্য যে, সংবাদপত্রের ওপর এখন সরকারের কোনো সেন্সর নেই, সামরিক শাসনামলের মতো গোপন নোট নেই। তবে কণ্ঠ চেপে ধরা আইন, হামলা, মামলার মধ্য দিয়ে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা সাংবাদিকদেরও ভাবিয়ে তোলে। তাই আমরা যা লিখতে চাই, বলতে চাই_ তা পারি না। নিজেরাই সমূহ বিপদ থেকে সাবধান হই। নিজেদের লেখা নিজেরাই সেন্সর করি। যেটিকে বলা যায়,

স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। এ ধরনের সেন্সর সংবাদপত্রের জন্য স্বস্তিকর নয়। যা দিন দিন সংবাদপত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একসূত্রে গাঁথা। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের ক্ষেত্র সংকুচিত হলে সংবাদপত্রে তার প্রভাব পড়বে না, তা কখনও হয় না। তবে আশার কথা, গণতন্ত্র ও সংবাদপত্র নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সাময়িক বাধাপ্রাপ্ত হলেও পথ হারায়নি।

পরিশেষে বলব, সাংবাদিক বা সংবাদপত্র রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, সহযাত্রী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে; গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রকে হাত ধরাধরি করে চলতে হবে  এর বিকল্প নেই।

লেখক

আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক

ask_bangla71@yahoo.com

 

1 Comment

  1. আবু সাঈদ খান says:

    খুব সুন্দর লেখা ।

Post a Comment