Home » কলাম » মাহবুবুল হক বিনম্র শ্রদ্ধা-আবু সাঈদ খান

 
 

মাহবুবুল হক বিনম্র শ্রদ্ধা-আবু সাঈদ খান

 
 

Subjects

Tags

buet Chittagong Chittagong Hill Tracts Chittagong Hill Tracts Peace Accord communication education medical Padma Bridge Peace Accord road student politics train ইতিহাস উল্টা হাওয়ায় এক সাইকেল আরোহী এ কেমন কর্তব্যবোধ! এরশাদ কার কাজ কতটুকু কালাকাল গণতন্ত্র গণমুখী চাই প্রকৃতি ও মানববান্ধব উন্নয়ন চিন্তা জনগণ তার হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় দর্শন দলিল দি জুবলী হোটেল :সময়ের মানচিত্র নীরব রায়ে ফুটল হুল নূর হোসেন ফরিদপুর বাংলাদেশ বিকল্প ভিডিও মহাজোট সরকারের চার বছর মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি রুগ্ণ গণতন্ত্র বলিষ্ঠ পেশিতন্ত্র সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে ভাবুন সংঘাত সমাজ রূপান্তরের অভিযাত্রী সমাধান স্বাধীনতা হিন্দুত্ববাদীদের নিশানা ধর্মনিরপেক্ষতা ১৯৭১

আবু সাঈদ খান : আ ফ ম মাহবুবুল হক চলে গেলেন। তিনি ছিলেন বাসদের আহ্বায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা-উত্তর গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির লড়াইয়ের অন্যতম রূপকার।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তবে ১৩ বছর ধরেই তিনি অসুস্থ। ২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর ঢাকার রমনা পার্কের সামনে গাড়ি, না অজ্ঞাত ঘাতকের আঘাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন- সে রহস্য এখনও উন্মোচিত হয়নি। এ ঘটনার পর তিনি আর পুরোপরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। অসুস্থ অবস্থায় কানাডায় স্ত্রী-কন্যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তার স্মৃতিভ্রম ঘটেছিল। পেছনের সবকিছু মনে করতে পারতেন না। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে মূর্ছা যান। তখন তাকে অটোয়ায় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মাহবুবুল হকের জন্ম নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামে। বাবা ছিলেন চট্টগ্রামের এক মসজিদের ইমাম। বাবা মাহবুবকে চট্টগ্রামে তার কাছে নিয়ে যান এবং মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি করান। কলেজ জীবনও কেটেছে চট্টগ্রামে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৪ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় চতুর্থ এবং ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১১তম স্থান লাভ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে।
নিজেকে পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। ‘৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্রলীগের কর্মী হন। ‘৬৯-এর গণআন্দোলনের মিছিলের পরিচিত মুখ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্লোগান দিয়ে যেতেন। কোনো বিরতি ছিল না। বক্তা হিসেবে ছিলেন অনলবর্ষী।
তিনি ছিলেন স্বাধীনতাপন্থি (সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন নিউক্লিয়াসের সংশ্নিষ্ট) ও সমাজতন্ত্রপন্থি। ছাত্রলীগকে স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্র অভিমুখী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ শিবিরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সমাজতন্ত্রের দীক্ষা দিতেন।
স্বাধীনতা-পূর্বকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সহসম্পাদক ছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জাসদ সমর্থক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হয়েছিলেন। জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৮০ সালে মতাদর্শিক কারণে জাসদ ছেড়ে খালেকুজ্জামান ও অন্যদের সঙ্গে বাসদ গঠন করেন। ১৯৮৩ সালে বাসদ বিভক্ত হলে তিনি বাসদের একাংশের সভাপতি হন।
মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে কত যে একই সঙ্গে মিছিলে চলেছি, একই মঞ্চে বক্তৃতা করেছি, তার হিসাব নেই। তবে স্বাধীনতার আগে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। মাহবুব ভাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা, তখন আমি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী। তার সঙ্গে আমার দেখা হয় ‘৭২ সালে, পল্টনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রপন্থি ছাত্রলীগের সম্মেলনে। আমি তখন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং তখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্যপদে আমাকে কো-অপ্ট করা হয়েছে, তা পত্রিকায় দেখেছিলাম। সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে কমিটির কোনো সভায় আসিনি। সম্মেলনের এক ফাঁকে বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি বসল। আমি হাজির হলাম। মাহবুব ভাই স্বভাবসুলভ রসিকতা করে বললেন, আমাদের সৌভাগ্য, আবু সাঈদ খান সভায় এসেছেন। তিনি হাজির হয়ে রেকর্ড গড়লেন যে, তিনি একটি সভায় এসেছেন। না এলেও রেকর্ড হতো- তিনি একটি সভায়ও আসেননি। সে সময়ের টান টান উত্তেজনার মধ্যেও মাহবুব ভাইয়ের রসিকতা সবাই উপভোগ করলেন। রসিকতা আর টিপ্পনী কাটায় তিনি ছিলেন খুবই পারঙ্গম। সে পরিচয় পেয়েছি বহুবার। অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এই মানুষটির জীবন ছিল ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল, প্রাপ্তিযোগ তেমন ছিল না। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহসভাপদি পদে অনিবার্য বিজয় ছিনতাই হয়ে গেল। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা থেকে মাত্র কয়েকশ’ ভোটে হেরে গেলেন। এসব নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল না। তিনি ছিলেন সদা-সংগ্রামী। সংগ্রামের পথ চলাতেই ছিল তার আনন্দ।
২০০৪ সালে অজ্ঞাত ঘাতক বা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে শুনে সমকাল প্রকাশক এ. কে. আজাদ ও আমি সেখানে গেলাম। তখন তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ায় বিলম্বিত হচ্ছিল। হাসপাতালের কর্মকর্তা বলছিলেন, অপারেশন শুরুর আগে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। নইলে কাজ শুরু হবে না। মাহবুবুল হকের স্ত্রী কামরুন্নাহার বেবী বলছিলেন, ‘কারও বাসায় কি এত টাকা থাকে? আগামীকাল সকালে ব্যাংক খুললে আপনাদের সব টাকা পরিশোধ করব।’ কিন্তু কর্মকর্তা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। এ দৃশ্য দেখে আমার কান্না এলো। এ. কে. আজাদের দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চোখে জল। পকেট থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে ওই কর্মকর্তার হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমি হা-মীম গ্রুপের এমডি। আমার কার্ড রাখুন। সকালে ৫০ হাজার পাঠিয়ে দেবো। আর যত টাকা বিল আসবে, আমি পরিশোধ করব।’ ‘জি স্যার’ বলে ওই কর্মকর্তা ভেতরে গেলেন। অপারেশন শুরু হলো। এ. কে. আজাদ কথা রেখেছিলেন। সব খরচ বহন করেছিলেন। তাকে উন্নত চিকিৎসায় থাইল্যান্ডে পাঠানোর আলোচনা হচ্ছিল। তখন এ. কে. আজাদ সে ব্যয় বহনের প্রস্তাব নিজ থেকেই করেছিলেন। তবে মাহবুব ভাইয়ের স্ত্রী বেবী তাকে কানাডায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিয়েও গেলেন।
সেই থেকে মাহবুব ভাই কানাডা প্রবাসী। কয়েক বছর আগে এক লোক আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, আমি অফিসে আছি কি-না। বললেন, মাহবুব ভাইকে নিয়ে আসছেন। আমি বুঝলাম না, কোন মাহবুব ভাইয়ের কথা বলছেন। আমি কাজ করছি। হঠাৎ আমার সামনে আ ফ ম মাহবুবুল হক এসে হাজির। বললেন, সাঈদ কেমন আছো? চলো আজাদের অফিসে যাই। তার একমাত্র কন্যা উৎপলা ক্রান্তির বিয়ের কার্ড দিতে এসেছেন। মাহবুব ভাই, এ. কে. আজাদ ও আমি একসঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালাম। আমরা বুঝতে পারলাম, তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। স্মৃতি বিভ্রাটের মধ্যে আছেন। তার সঙ্গে শেষ দেখা তার ঢাকার বাসায় গত বছর। মইনুদ্দিন চৌধুরী লিটন ও আরও কেউ কেউ ছিলেন। তার সঙ্গে কথা হলো, কিন্তু আমাকে চিনতে পেরেছেন বলে মনে হলো না। মাহবুব ভাই তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রসিকতাও করছিলেন, ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রে মুক্তি নেই, সমাজতন্ত্রই মুক্তির পথ,’ বলছিলেন। আবার কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন।
মাহবুবুল হক আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক। এই সৎ, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবীর প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

Tags:

 

No comments

Be the first one to leave a comment.

Post a Comment