Home » কলাম » ‘দুজনে দেখা হল…’

 
 

‘দুজনে দেখা হল…’

 
 

Subjects

Tags

buet Chittagong Chittagong Hill Tracts Chittagong Hill Tracts Peace Accord communication education medical Padma Bridge Peace Accord road student politics train ইতিহাস উল্টা হাওয়ায় এক সাইকেল আরোহী এ কেমন কর্তব্যবোধ! এরশাদ কার কাজ কতটুকু কালাকাল গণতন্ত্র গণমুখী চাই প্রকৃতি ও মানববান্ধব উন্নয়ন চিন্তা জনগণ তার হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় দর্শন দলিল দি জুবলী হোটেল :সময়ের মানচিত্র নীরব রায়ে ফুটল হুল নূর হোসেন ফরিদপুর বাংলাদেশ বিকল্প ভিডিও মহাজোট সরকারের চার বছর মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি রুগ্ণ গণতন্ত্র বলিষ্ঠ পেশিতন্ত্র সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে ভাবুন সংঘাত সমাজ রূপান্তরের অভিযাত্রী সমাধান স্বাধীনতা হিন্দুত্ববাদীদের নিশানা ধর্মনিরপেক্ষতা ১৯৭১

আবু সাঈদ খান : সৈয়দপুর বিমানবন্দরে দেখা হলো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ব্যাপারটা কি রবীন্দ্রনাথের সেই গানের মতো- ‘দুজনে দেখা হল মধুযামিনী রে-/ কেন কথা কহিল না, চলিয়া গেল ধীরে।।’ না, এমন আবেগতাড়িত সাক্ষাৎ নয়। তবে এ সাক্ষাৎ যে নেহাত সৌজন্যমূলক নয়, তা আন্দাজ করা যায়। তা ছাড়া গানে কথা না-বলার বেদনা আছে। এ দুই নেতার সাক্ষাতে তা নেই। দু’জনের কথাও হয়েছে।

সম্পর্কের বরফ গলানো বলে কথা আছে। কাদের-ফখরুলের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে সেই বরফের গায়ে যে কিঞ্চিৎ উষষ্ণ হাওয়া লেগেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

ওবায়দুল কাদের পেছন থেকে ডেকে বলেছেন, ভাই, কেমন আছেন? মির্জা ফখরুল ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ান এবং জানতে চান, তিনি কেমন আছেন। তারপর হৃদয়তাপূর্ণ পরিবেশে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ওবায়দুল কাদের ‘পারফেক্ট জেন্টলম্যান’। কাদের আলোচনার দ্বার খোলা রাখার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তার এ উপলব্ধি যথার্থ। রাজনীতিকদের মধ্যে দেখা হবে না, কথা হবে না- তা কতটুকু সমর্থনযোগ্য? দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। কবে যে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তা মনে পড়ছে না। তবে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তাদের টেলিফোনে বাক্যবিনিময় হয়েছিল; সেটি বহুল আলোচিত। দুই সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিবের মধ্যে যে কথাবার্তা হয় না- তা সৈয়দপুর বিমানবন্দরে সাক্ষাতের সময় বোঝা গেল। এর বাইরে অন্য নেতাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয় সামাজিক অনুষ্ঠান, সেমিনার বা গোলটেবিল, টকশোসহ নানা স্থানে। আমি তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে দেখেছি। শুনেছি, এক সময়ে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে বেশ কথাবার্তা হতো। ২০০৬-এ এই দুই নেতার মধ্যে ম্যারাথন আলোচনাও হয়েছিল। তারা একমত হতে পারেননি। একমত হতে পারলে সম্ভবত এক-এগারো ঘটত না। এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। একমত হওয়া-না হওয়া পরের কথা। আগে প্রয়োজন- সৌজন্যবোধ, পরস্পরের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ। এটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মর্মবাণী।

আজ কেবল সৌজন্যের খাতিরেই নয়, রাজনৈতিক প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে সংলাপ জরুরি। কারণ, ২০১৪ সালে যে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হয়েছিল, তা নিয়ে আর দ্বিমতের সুযোগ নেই। বিএনপি বলছে, এটি ছিল নীলনকশার নির্বাচন। আর সরকার বিএনপিকে দুষছে এই বলে যে, তারা নির্বাচনে অংশ নিলে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন না। সে যাই হোক, এবার আর কেউ এর পুনরাবৃত্তি চাইছেন না। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, তিনি আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না। এখন প্রশ্ন, কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে? আওয়ামী লীগ বলছে, দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। বিএনপি বলছে, শেখ হাসিনা বা দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। সহায়ক সরকার করতে হবে। দলটি এখনও সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়নি। তবে বক্তৃতা-বিবৃতিতে দলনিরপেক্ষ সরকারের কথাই বলছে। এর মানে, নতুন করে সেই পুরনো বিতর্ক। যে বিতর্কের সুরাহা না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ও আরও কতিপয় দল অংশ নিল না। অর্থবহ নির্বচনও হলো না। এটি সবার বোধগম্য যে, সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা ভিন্ন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না।

আজকের বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের দুই বড় দল। এরশাদের আমল বাদ দিলে বলা যায়, এই দুই দলই পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে। তারা এখনও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী। সে বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি বিএনপিকে বাদ দিয়েও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব দলের অংশগ্রহণ জরুরি। আর সেটি কখনোই সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না নির্বাচনকালীন সরকার ও ব্যবস্থা নিয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যে মতৈক্য হচ্ছে।

আমরা স্পষ্টত তিনটি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পার্থক্য দেখছি। এক. নির্বাচনকালে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার আর বিএনপি সহায়ক সরকারের কথা বলছে। দুই. আওয়ামী লীগ সংসদ রেখে নির্বাচন এবং বিএনপি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি করছে। তিন. বিএনপি সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে নির্বাচনে মোতায়েনের প্রস্তাব করছে। আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচন কমিশন প্রচলিত আইনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন করতে পারে। এ ব্যাপারে ঐকমত্য জরুরি। আর ঐকমত্যে পৌঁছতে আলোচনার বিকল্প নেই।

রাজনৈতিক সংলাপের অভিজ্ঞতা ততটা মধুর নয়। ২০০৬ সালের অক্টোবরে আবদুল জলিল ও আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে ছয়টি বৈঠক হয়েছিল। ফলাফল শূন্য। রাজনৈতিক মতবিরোধ মেটাতে নানা সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোও মধ্যস্থতা করেছিলেন। না, কোনো ফলোদয় হয়নি। আমাদের রাজনীতিকদের মনোভাব- সালিশ মানি, কিন্তু তালগাছ আমার। এমন মনোভাবের পরিবর্তন ছাড়া কি সমঝোতা আদৌ সম্ভব?

আলোচনার ফলাফল সর্বদাই শূন্য নয়। যখনই নেতারা উদার হতে পেরেছেন, জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিতে পেরেছেন; তখনই সাফল্য এসেছে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে আলোচনার টেবিলেই তিন জোটের রূপরেখা প্রণীত হয়েছিল। আলোচনার মাধ্যমেই ‘৯১-এর সংসদে সংসদীয় সরকারে পুনঃপ্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়েছিল। আজকের সংকট মোকাবেলায়ও প্রয়োজন আলোচনা। আলোচনার বিকল্প আরও আলোচনা।

কেউ কেউ বলছেন, সংবিধানে দলীয় সরকারের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আসলে সদিচ্ছা থাকলে সংবিধান কোনো বাধা নয়। এ প্রসঙ্গে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা যায়। সংবিধানে এমন বিধান ছিল না। কিন্তু তা সংশ্নিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার কারণে সম্ভব হয়েছিল। আরও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তখন সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠিত হলে তা হতো সর্বদলীয় বা ঐকমত্যের সরকার। জানি, কেউ কেউ বলবেন, এবার এমন সুযোগ নেই। কারণ, বিএনপি সংসদের বাইরে। সে ক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বা মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা করার সুযোগ আছে। আমি কোনো প্রস্তাব করছি না। সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতারা নেবেন। তারাই ঠিক করবেন, নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে। তবে প্রত্যেকে যার যার অবস্থানে থাকলে হবে না। সব দলকেই ছাড় দিতে হবে, সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তবে উদ্যোগী হতে হবে সরকারকেই।

নির্বাচন অনুষ্ঠানই শেষ কথা নয়। নির্বাচনের পর বিজয়ী ও বিজিতরা কী আচরণ করবে- সেটিও বিবেচনার বিষয়। কতিপয় বিষয়ে ঐকমত্য ছাড়া গণতন্ত্রের যাত্রা সুগম হবে না। একমত হতে হবে- সংখ্যাগুরুরা সরকার গঠন করবে, তবে প্রতিপক্ষের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে না। সংখ্যালঘুরা বিজয়ীদের অভিনন্দন জানাবে এবং সংসদের বিরোধী আসনে বসবে। সংসদ বর্জন ও হরতালের রাজনীতি করবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন প্রশ্নেও ঐকমত্য থাকতে হবে। এমনই একটি সমঝোতা চুক্তি সময়ের দাবি।

সৈয়দপুরে কাদের-ফখরুলের সাক্ষাৎ গোটা দেশকে আশাবাদী করেছে। ভরসা দিয়েছে যে, দেশের রাজনৈতিক সংকটে নেতারা মুখ ঘুরিয়ে থাকবেন না। এক টেবিলে বসবেন, কথা বলবেন, সমাধানে পৌঁছবেন এবং অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে অঙ্গীকারবদ্ধ হবেন।

ask_bangla71@yahoo.com

সাংবাদিক

Tags:

 

No comments

Be the first one to leave a comment.

Post a Comment