Home » কলাম » এ কেমন কর্তব্যবোধ!

 
 

এ কেমন কর্তব্যবোধ!

 
 

Subjects

Tags

buet Chittagong Chittagong Hill Tracts Chittagong Hill Tracts Peace Accord communication education medical Padma Bridge Peace Accord road student politics train ইতিহাস উল্টা হাওয়ায় এক সাইকেল আরোহী এ কেমন কর্তব্যবোধ! এরশাদ কার কাজ কতটুকু কালাকাল গণতন্ত্র গণমুখী চাই প্রকৃতি ও মানববান্ধব উন্নয়ন চিন্তা জনগণ তার হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় দর্শন দলিল দি জুবলী হোটেল :সময়ের মানচিত্র নীরব রায়ে ফুটল হুল নূর হোসেন ফরিদপুর বাংলাদেশ বিকল্প ভিডিও মহাজোট সরকারের চার বছর মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি রুগ্ণ গণতন্ত্র বলিষ্ঠ পেশিতন্ত্র সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে ভাবুন সংঘাত সমাজ রূপান্তরের অভিযাত্রী সমাধান স্বাধীনতা হিন্দুত্ববাদীদের নিশানা ধর্মনিরপেক্ষতা ১৯৭১
আবু সাঈদ খান : প্রতিবছরই ঘটা করে পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন করতে দেখি। তখন বলা হয়, পুলিশ জনগণের বন্ধু; জনগণের সেবা করাই তাদের ব্রত। পুলিশ জনগণের সেবা করে না, বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়ায় না_ তা বলা যাবে না। কখনও কখনও পুলিশের জনহিতকর কাজে মুগ্ধ হই।

ক’দিন আগে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিলেন পুলিশ কনস্টেবল মো. পারভেজ মিয়া। ৭ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে ডোবার মধ্যে পড়ে যায়। কেউ আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় ডোবায় নামতে সাহস পাচ্ছিল না। কনস্টেবল পারভেজ কোনোদিকে না তাকিয়ে সেই ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইট নিয়ে ডুবে থাকা বাসটির কাচের জানালা ভাঙেন এবং বাসের ভেতরে ঢুকে যাত্রীদের উদ্ধার শুরু করেন। পারভেজের এই সাহসী ভূমিকায় অন্যরা উদ্ধার কাজে যোগ দেন। জানালার কাচে কেটে যাওয়া তার হাত দিয়ে রক্ত ঝরছিল; কিন্তু উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেদিকে তার নজর ছিল না। এই নিবেদিতপ্রাণ পুলিশকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে। জঙ্গি দমনে পুলিশ-র‌্যাবের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। এসব কিছুকে ছোট করে দেখার জো নেই। তবে সব ছাপিয়ে উঠেছে পুলিশের মারমুখী চরিত্র।
গত ২০ জুলাই রাজধানীর শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ৭টি কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল করছিল। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের প্রতিবেদনে জানা যায়_ মিছিলটি রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবিতে মুখরিত ছিল। তবে মোটেই মারমুখী ছিল না। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সরে যেতে বলে পুলিশ। তারা তা অগ্রাহ্য করলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। লাঠিপেটা, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী কাঁদানে গ্যাসে আহত হন। গ্যাসের শেলের আঘাতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র মো. সিদ্দিকুর রহমানের দুটি চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের প্রশ্ন, কোনো শান্তিপূর্ণ মিছিলে চড়াও হওয়া কতটুকু সঙ্গত? হাতে লাঠি-বন্দুক-কাঁদানে গ্যাস থাকলেই তা যথেচ্ছ ব্যবহার করা যায় না। আর ব্যবহারের নিয়ম-কানুন আছে। লাঠি হাতে থাকলেই কারও মাথায় তা দিয়ে আঘাত করা যায় না। কোনো আন্দোলনকারীকে নিশানা করে টিয়ার গ্যাস ছোড়া যায় না। অথচ ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, খুব কাছ থেকে গ্যাস শেলটি ছোড়া হয়েছে। আইজিপি একেএম শহীদুল হক বলেছেন, ‘দুই ধরনের বক্তব্য আছে। পুলিশ বলে তারা করেনি, কেউ ফুলের টব মেরেছে, ঢিল মেরেছে। কেউ বলে, পুলিশের টিয়ার শেল। টিয়ার শেল মারলে আমরা সাধারণত ৩০ বা ৪০ ডিগ্রি কোণে মারি। এভাবে কখনও টিয়াল শেল মারি না। এটা একটু অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তবু এটা ঘটেছে। সত্যিকারের ঘটনা বের করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সততা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।’ আইজি সাহেবের আন্তরিকতা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্তে সত্য উঠে আসার ঘটনা বিরল।

সিদ্দিকুর রাজধানীর চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসারত আছেন। তার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি আর ডান চোখে দেখতে পাবেন না। তবে বাঁ চোখে ক্ষীণ আশার আলো দেখা দিয়েছে। উন্নততর চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারি উদ্যোগে ভারতের চেন্নাই পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যায়, সিদ্দিকুর উন্নত চিকিৎসায় চোখের আলো ফিরে পাবেন। কিন্তু চোখের আলো ফিরে পাবেন না পিরোজপুরের কাউখালীর সবজি ব্যবসায়ী শাহজালাল। তিনি স্ত্রী-কন্যা নিয়ে খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার পর জনতা তাকে ছিনতাইকারী সন্দেহে পাকড়াও করে, গণপিটুনি দেয়। পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তার স্ত্রীর বক্তব্য, তাকে রাত ১১টায় সুস্থ দেখেছেন। পরদিন তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বজনরা সেখানে গিয়ে দেখতে পান, তার দুই চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, বিক্ষুব্ধ জনতা তার চোখ উপড়ে ফেলেছে (সমকাল, ১৯ জুলাই ২০১৭)। তিনি এখন অন্ধ। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, জনতা চোখ উপড়ে ফেললে তাকে হাসপাতালে না নিয়ে সারারাত থানায় রাখা হলো কেন? যদি ‘ছিনতাইকারী’ও হয়ে থাকেন, তাহলেও তার চোখ তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। পুলিশ দিন দিন যেন বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিনা উস্কানিতে সভা-সমাবেশের ওপর চড়াও হচ্ছে। বিএনপির একাধিক সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে আহত করা হয়েছে। গত বছর এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর জলকামান দাগিয়ে তাদের নাজেহাল করার দৃশ্য আমরা দেখেছি। কিছুদিন আগে সুপ্রিম কোর্টের চত্বর থেকে ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদ মিছিলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা লিটন নন্দীসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়েছে। সম্প্রতি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষার্থীদের মিছিলেও লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ায় অনেকে আহত হয়েছেন। পুলিশের হাতে সাংবাদিক নাজেহাল হওয়ার ঘটনা ডজন ডজন। অতি সম্প্রতি রাজনীতিবিদ আ স ম আবদুর রবের বাসায় একটি ঘরোয়া বৈঠকেও পুলিশ হানা দিয়েছে। বরগুনার ইউএনও গাজী তারিক সালমনকে কোর্ট হাজতে নেওয়ার সময় কিছু পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে, তাকে হাত ধরে টেনে হাজতে পুরেছে (সে জন্য অবশ্য তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে)। লক্ষণীয়, নতুন ঘটনায় পুরনো ঘটনা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের এসব বাড়াবাড়ি ঘটনা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না।

চটজলদি কোনো সমাধানও নেই। সমস্যার গভীরে যেতে হবে। একদা ব্রিটিশ ভারতে বিদ্রোহীদের দমনে পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। তখন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী তাদের স্বার্থে পুলিশকে খুশিমতো ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানি আমলে পুলিশ শাসকগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। আর স্বাধীনতার পরও ওই ধারা অব্যাহত আছে। যে গোষ্ঠী বা দল ক্ষমতায় এসেছে, পুলিশ তাদের সেবা করেছে। তারা যে সংবিধান ও আইন দ্বারা পরিচালিত, কোনো দলের আজ্ঞাবহ নয়; আমাদের পুলিশ বা প্রশাসনে সেই বোধোদয় কি হয়েছে? এ জন্য প্রয়োজন পুলিশি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার_ এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এ নিবন্ধে নেই।

ইদানীং নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সেটি হলো_ পুলিশের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। দলীয় কর্মীরা পুলিশে যোগ দেবে_ তা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের পর তাদেরকে দলীয় চৌহদ্দির ঊধর্ে্ব উঠে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। তাদেরকে দায়িত্ব পালনকালে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল পরিচয় ভুলতে হবে। আর সেটি ভুলতে দিচ্ছে না ক্ষমতাসীনরা। যে দলই ক্ষমতায় আসে, সেই দলই রাজনৈতিক পরিচয় খুঁচিয়ে তোলে। ক্ষমতাসীন সরকার তার সমর্থকদের সুবিধাজনক জায়গায় পোস্টিং দেয়, আর অন্য দলের সমর্থকদের সারদায় বা দাপ্তরিক কাজকর্মে নিয়োজিত করে। এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে, দলীয় স্বার্থে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। সরকার যখন পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে, তখন কিন্তু তাদের সরকারকেও ব্যবহারের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পুলিশ যখন ক্ষমতাসীনদের পক্ষে একটি অপকর্ম করে, তখন নিজেদের স্বার্থে একাধিক অপকর্মের সুযোগ পায়। তাই পুলিশি ব্যবস্থা বা কর্মধারার পরিবর্তনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশকেও তাদের কাজ ও ক্ষমতার সীমানা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে এবং বুঝতে হবে, সভা-সমাবেশ করা জনগণের অধিকার। সেই অধিকার সংবিধান দিয়েছে। পুলিশের কাজ জনগণের যে কোনো অংশের অধিকার আন্দোলনকে সম্মান করা, হয়রানি করা নয়। তাদের ভুললে চলবে না, তারা জনগণের অংশ। ওই মিছিলকারীরা তাদের ভাই, বোন বা পুত্র-কন্যাসম। সে মমত্ববোধ থাকলে পুলিশ কি এমন বেপরোয়া হতে পারত!

বর্তমান বিশ্বে পুলিশের ধারণা বদলেছে। পুলিশ অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর মতো বাহিনী নয়, এটি সেবা প্রতিষ্ঠান। অতএব, পুলিশকে সেবার (সার্ভিস) মানসিকতা ধারণ করতে হবে।

আমাদের কারও ভুলে যাওয়া উচিত নয়, মিছিলে মিছিলে জাতির সূর্যোদয় হয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনে যা কিছু অর্জন, তার অনেক কিছুই সংগ্রামের ফসল। একদা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনও মিছিলে হেঁটেছেন,নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংগ্রামের মিছিলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দেখেছি। হয়তো শাহবাগের মিছিলের মধ্যে লুকিয়ে আছেন আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক কিংবা কোনো যুগনায়ক। তাই মিছিলকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা দরকার। মনে রাখা দরকার, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়; তারা আর যাই হোক_ অসম্মানের পাত্র নয়।

লেখক

আবু সাঈদ খান
সাংবাদিক

Tags:

 

1 Comment

  1. আবু সাঈদ খান says:

    সুন্দর লেখা ।

Post a Comment